দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমায় দগ্ধ রোগীরা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ণ ইউনিট ভর্তি হলেও আর বাসায় ফিরতে চাচ্ছেন না তারা।
হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তাররা বলছেন, পেট্রলবোমার বা ককটেলের বিকট আওয়াজের ধ্বনি এখনো তাদের কানে বাজে। অনেকে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করতে চান না তার অঙ্গার অবস্থা। রোগীদের অনেকের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই আতঙ্ক তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যাওয়ায় স্থায়ীভাবে মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এমনই এক রোগী বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার সাজু মিয়া (৩০)। পেট্রল বোমার আঘাতে দগ্ধ হয়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি বিছানায় পড়ে থাকার কারণে তিন মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী শাহানাজ না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন।
কান্নাজড়িত কন্ঠে শাহানাজ বলেন, 'আমাদের জন্য কিছু করেন। আমার স্বামীর কিছু হয়ে গেলে তিন মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।'
এসময় অগ্নিদগ্ধ স্বামী সাজু হঠাৎ বলে উঠেন, 'আগুন, আগুন। আমাকে এখান থেকে সরাও। গায়ে আগুন লাগছে।'
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শাহানাজ জানান, সুস্থ মানুষটি আগুনে পুড়ে গেছে। এরপর থেকে ভুলভাল বকছে। হঠাৎ ভয়ে জড়োসড়ো হচ্ছে। কখনো চিৎকার করে বলছে আগুন, আগুন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল বলেন, গত ৫ জানুয়ারির পর থেকে পেট্রল বোমা হামলা ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে ১০৪ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩ জন চিকিৎসা শেষে ছুটি নিয়েছেন। বর্তমানে ৫২ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর বাইরে প্রতিদিন ৫/৭ বা এর বেশি মানুষ দগ্ধ হয়ে ভর্তি হচ্ছেন বার্ন ইউনিটে।
তিনি বলেন, দগ্ধদের অবস্থার উন্নতির জন্য প্রায় ৯০ জনের বেশি চিকিৎসক বিভিন্ন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। আহতদের শরীরের ১২ থেকে ৪৮ ভাগ দগ্ধ হয়েছে।
দগ্ধ রোগীদের মধ্যে মানসিক কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানসিক সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কোনো মানুষ বাসে ঘুমাতে ঘুমাতে বোমার ফাটার বিকট আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে এরপর তারই শরীর পুড়ে যায় আগুনে। এটা কোনো স্বাভাবিক মানুষ মেনে নিতে পারে না। সে কারণে অনেকের মধ্যে ভয় বা আতঙ্ক কাজ করে।
তিনি বলেন, আমরা আপাতত মানসিক সমস্যার বিষয়টির চাইতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি শারীরিক সমস্যাকে। কারণ শারীরিকভাবে সুস্থ হতে না পারলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সুস্থতার পর মানুসিক সমস্যা উত্তরণে কাজ করা সম্ভব।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জিল্লুর রহমান খান (রতন) বলেন, প্রচন্ড ভয় থেকে মানুষের মানসিক সমস্যা হতে পারে। কারণ কল্পনার বাইরে গিয়ে কোনো কিছু ঘটে গেলে তা মানতে না পারার কারণে সমস্যা দেখা দেয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইকিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, ভয় বা আতঙ্ক থেকে মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে। বোমার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলে বা পেট্রল বোমায় দগ্ধ হওয়ার পর রোগীদের মধ্যে সব সময় সেই ভয়াল দৃশ্যের কথা মনে পড়ে আর শিউরে উঠে।
অনেকে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আবার অনেকে জ্ঞান না হারালেও সেই ভয়টা ভেতরে পুষতে থাকে। যা পরবর্তীতে মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়।
আবার যারা দগ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বাস্তবতার কারণে তাদের মানসিক সমস্যার আগে শারীরিকভাবে সুস্থতা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, কোনো রোগী যখন শারীরিকভাবে সুস্থতার পর আয়নায় নিজেকে দেখে তখন উৎকণ্ঠা আর ভয় কাজ করে। ভয় আর আতঙ্কের কারণে তারা ডিপ্রেশনে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, যারা দগ্ধ হচ্ছেন তাদের বেশিরভাগ মানুষই গরীব। কোনো পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটিই যখন দগ্ধ হয়ে অসুস্থতা নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন, তখন পরিবারের খাওয়ার চিন্তা নিজের চিকিৎসার খরচের চিন্তা বিষদভাবে ভর করে মনে। এ কারণে তারা নানা ধরনের খারাপ চিন্তা তাদের ওপর ভর করে।
এমন রোগীদের মধ্যে Post-traumatic stress disorder (পিটিএসডি) রোগের আবির্ভাব ঘটে। যে কারণে ৫/৬ মাস বা অনেকক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় তাদের মধ্যে এই সমস্যা থেকে যায় বলেও জানান তিনি।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা ও পুনবার্সনে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।
দগ্ধ মানুষগুলো যাতে দুশ্চিন্তায় না ভোগে সেজন্য দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উত্তরণে সাহস যোগাতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জাতীয় মানসিক হাসপাতালে এমন রোগীদের চিকিৎসার কোনো প্রস্তুতি রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখানে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় অসুস্থ অনেক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকার প্রয়োজনবোধ করলে আমরা দগ্ধ রোগীদের মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
কেএইচ





