বর্ষা এলেই আমাদের শহরে শুরু হয়ে যায় জলাবদ্ধতা। আমরা দোষ দিই আরেক জনকে; কিন্তু কখনো ভেবে দেখি না যে, এ জলাবদ্ধতা আমাদেরই অসচেতনতার ফল। বাড়ির ময়লা থেকে শুরু করে চকলেটের খোসা সব নিয়ে গিয়ে ফেলি ড্রেইনে, রাস্তায়! ড্রেইন ভরাট করে নিজেরাই জলাবদ্ধতার পথ তৈরি করি, আর দোষারোপ করি প্রশাসনকে! নিজেরাই রাস্তা নোংরা করি, আর এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করি!
অথচ, আমাদের খানিকটা সচেতনতাই আমাদের শহরকে করে তুলতে পারে মনোরম, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর!
দেহ সুস্থ রাখার জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম ধর্মও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র একটি বিখ্যাত হাদীসে বলা হয়েছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ পবিত্র ইসলাম ধর্মকে পবিত্রতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সাজ সজ্জার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
শারীরিক সুস্থতা এবং দীর্ঘ জীবন লাভের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই পরিবারেরর বড়রা যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে তেমনি শিশুদেরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস করে তুলতে হবে। রোগ-জীবাণুকে দুরে রাখতে হলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব
স্বাস্থ্য পরিচর্যা হচ্ছে একজন ব্যক্তির এমন কিছু আচরণ বা অভ্যাস যা তাকে তার নিজের দেহ মনকে সুস্থ রাখার স্বার্থে প্রতিনিয়ত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে স্ব-উদ্যোগে পালন করতে হয়। যেমন:
• ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য
• কৃমি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য
• অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য
• চর্মরোগ প্রতিরোধ করার জন্য
• স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য
• ডাক্তারের পেছনে খরচ কমানোর জন্য
ব্যক্তিজীবনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
• কাজকর্ম করার ফলে আমাদের শারীরিক পরিশ্রম হয় এবং তার ফলে শরীর থেকে ঘাম বের হয়। নিয়মিতভাবে শরীরের ত্বক পরিষ্কার না করলে লোমকূপগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঘামের সাথে দুষিত পদার্থ শরীর থেকে বের হতে না পেরে নানা রকম চর্মরোগের সৃষ্টি হয়। তাই প্রত্যেকের উচিৎ প্রতিদিন গোসল করা এবং মাঝে মাঝে সাবান ব্যবহার করা। তাহলে শরীরের ত্বক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে এবং চর্মরোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
• মাথার চুল মাঝে মাঝে সাবান বা শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করে ভাল তেল ব্যবহার করা উচিত। নিয়মিত চুল আঁচড়ালে চুলের ব্যায়াম হয় এবং এর ফলে চুলে উকুন এবং খুসকী জন্মাতে পারে না ।
• ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন-পোশাক পরিচ্ছদ, কাপড় চোপড়, বিছানা, বালিশ, চাদর ইত্যাদি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে শরীরে খোস পাঁচড়া ইত্যাদি চর্মরোগ হতে পারে।
• খাওয়ার পর ভালভাবে মুখ ও দাঁত পরিষ্কার না করলে খাবার পচে মুখে দুর্গন্ধ এবং নানা রকম দাঁতের রোগ হয়। সেজন্যই প্রত্যেকবার খাওয়ার পর ভাল করে দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করতে হয়।
• প্রতি সপ্তাহে একবার হাত ও পায়ের নখ কাটা উচিৎ। কারণ হাতের নখের নিচে ময়লা জমে খাবারের সাথে পেটে চলে গিয়ে নানা রকম রোগের সৃষ্টি হয়।
• প্রতিবার মলত্যাগের পর সাবান বা ছাই ও পানি দিয়ে ভালভাবে হাত ধোয়া উচিত। তা না হলে মলের রোগ জীবানু খাদ্যের সাথে মিশে পেটের অসুখ হতে পারে। এসব ব্যাপারে ছোট বেলা থেকেই শিশুদের অভ্যাস করানো উচিৎ। খাওয়ার আগে দুই হাত ধুয়ে খাবার খাওয়া উচিৎ।
হাত ধোয়ার পদ্ধতি
• প্রথমে হাতের ঘড়ি, আংটি, চুড়ি ইত্যাদি খুলে পানি দিয়ে হাত ভিজিয়ে নিতে হবে
• হাতের কুনুই অবধি ভালভাবে সাবান লাগান এবং প্রচুর ফেনা তৈরী করতে হবে
• নিম্নের বর্ণনানুযায়ী ভালোভাবে হাত ঘষে পরিষ্কার করতে হবে
• দুই হাতের তালু পরস্পর
• ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠে
• বাম হাতের তালু ডান হাতের পিঠে
• এক হাতের আংগুলের পিঠ অন্য হাতের তালুতে
• এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী অন্য হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
• দুই হাতের তালু পরস্পর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
• পরিষ্কার পানির ধারায় দুই হাত ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে
• শুকনো ও পরিষ্কার তোয়ালে/ কাপড়ে হাত মুছে নিন বা বাতাসে শুকিয়ে নিতে হবে
পরিবারিক জীবনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
পরিবারের প্রতিটি সদস্য যদি ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্চন্নতার নিয়মাবলী অবহিত থাকে এবং নিয়মিত সেগুলি মেনে চলে তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই পারিবারিক জীবনও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে। এজন্যে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন পরিবারের কর্তা ও অন্যান্য বয়স্ক সদস্যদের সচেতনতা ও নিয়মাবলী মেনে চলার প্রবণতা। পরিবারের অল্প বয়সী শিশুরা সাধারনতঃ বয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকেই বিভিন্ন অভ্যাস অনুকরণ করতে শেখে। যদি কখনো তাদের কোন অভ্যাসে ভুল ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় তবে বয়স্ক সদস্যদের উচিত সেগুলি শুধরে দেয়া এবং সঠিক পদ্ধতি অনুকরন ও অনুসরন করতে শেখানো। এর ফলে পারিবারিক জীবনেও সুস্থ্যতা বজায় থাকবে। পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যদের আরও কতগুলি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, না হলে পারিবারিক জীবনের পরিচ্চন্নতা নষ্ট হবে।
এই বিষয় গুলো হলো
• পরিবারের খাদ্যাভাস, খাদ্য আহরণ, খাদ্য প্রস্তুত করণ ও খাদ্য সংরক্ষণ প্রণালীতে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
• পান করা, ধোয়া-মোছা এবং গোসলের পানি পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখা। কারণ পানি সংগ্রহের উৎস থেকেই সাধারনত দূষণ ক্রিয়া ঘটে থাকে
• পরিবারের সদস্যদের জন্য যথোপযুক্ত শৌচাগার ও গোসলখানার ব্যবস্থা রাখা
• পরিবারের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থানে ফেলার ব্যবস্থা থাকা
• বাসস্থান সংলগ্ন এলাকাতে পরিবেশ দূষন ও স্বাস্থ্যহানির কোন স্থায়ী বা অস্থায়ী উৎস আছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা
সামাজিক জীবনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
সামাজিক জীবনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা শুধু নিজে অথবা পরিবারের সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলেই চলবে না, আশেপাশের সামাজিক প্রতিবেশ ও পরিবেশের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন
• প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি
• পানির নিরাপদ উৎসের ব্যবহার
• কুয়া ঢেকে রাখা
• পানি যদি নিরাপদ উৎসের না হয়, তবে তা ফুটিয়ে পান করলেও পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব
• রান্নাবান্না,খাবার,গোসল এবং ধোয়ামোছোর কাজে যে পানি ব্যবহার করা হয় তার উৎস থেকে যথেষ্ঠ দূরত্ব রেখে মলমূত্র এবং নোংরা পানি (বিশেষ করে স্যানিটারী ল্যাট্রিনের পানি) নিষ্কাশন করা
• যত্রতত্র মলমুত্র ত্যাগের কুফল সর্ম্পকে জানা ও জানানো
• স্যানিটারী ল্যাট্রিন ব্যবহার করা
• আবর্জনা ও বর্জ্য দ্রব্যের নিরাপদ অপসারণ ব্যবস্থা
• গৃহস্থালী আবর্জনা পুড়িয়ে বা মাটিতে পুঁতে ফেলা
• খাদ্যে নিরাপত্তা রক্ষা ইত্যাদি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা সৃষ্টি
• পরিবেশ দূষনের উৎস যেমন পঁচা, এদো ডোবা বা নর্দমার সংস্কার অথবা কাছাকাছি উৎস থেকে দূষিত পদার্থ নির্গমণের ব্যবস্থা দুর করা
খাদ্য পরিবেশনে পরিচ্ছন্নতা
• খাদ্য প্রস্তুত,পরিবেশন ও খাবার আগে সাবান দিয়ে দু’হাত ভালভাবে ঘষে ধুয়ে নিতে হবে।
• যেসব জিনিস রান্না করে খেতে হয় সেসব জিনিস কাঁচা খাওয়া বিপদজনক। রান্নার আগে সকল কাঁচা খাদ্যবস্তু (যেমন-তরিতরকারি, মাছ, মাংস ইত্যাদি )নিরাপদ পানি (যেমন সবুজমুখো টিউবয়েল, ট্যাপ বা রিং কুয়ার পানি) দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
• রান্না করলে খাদ্যবস্তুর জীবাণু মরে যায়। রান্নার সময় খাদ্যবস্তু, বিশেষ করে মাছ ও মাংস ভাল করে সিদ্ধ করতে হবে।
• রান্না করা খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে হবে যাতে খাবারে রোগজীবাণু জন্মানোর সুযোগ না পায় এবং রোগ সৃষ্টি করতে না পারে।
• রান্না করা খাবার ৫ ঘন্টার বেশি সময় রেখে দেয়া হলে তা পুনরায় ভালভাবে গরম করে খেতে হবে।
• কাঁচা খাদ্যবস্তুর সংস্পর্শে এলে রান্না করা খাবারে রোগজীবাণূ ছড়াতে পারে। এ কারণে কাঁচা খাদ্যবস্তু ও রান্না করা খাবার সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। বটি, দা, ছুরি, মাংস কাটার তক্তা ইত্যাদি ব্যবহারের পর ভালভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
o পাস্তুরিত অথবা জ্বাল দেয়া দুধ নিরাপদ। কাঁচা দুধ নিরাপদ নয়।
o শিশুদের জন্য খাবার তৈরি করে তুলে না রেখে খাওয়ানোর আগে তৈরি করে নিতে হবে।
o বাসনপত্র মোছার কাপড় প্রতিদিন ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং তা মাঝেমাঝে সিদ্ধ করতে হবে।
o মাছি,তেলাপোকা ,পিঁপড়া, ইঁদুর, বিড়াল, কুকুর এবং অন্যান্য পোকামাকড় ও প্রাণীর নাগাল থেকে খাদ্যবস্তু দূরে রাখতে হবে এবং তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবস্থায় ঢেকে রাখতে হবে। এজন্য ঢাকনাওয়ালা পাত্র ব্যবহার করা উত্তম।
o খাবারের ফেলে দেয়া অংশ, ফলমূল, তরকারির খোসা ইত্যাদিতে রোগজীবাণু জন্মে এবং মাছির মাধ্যমে তা ছড়াতে পারে। প্রতিদিনের আবর্জনা পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রত্যেক বাড়িতে নির্দিষ্ট গর্ত থাকা দরকার।
এএইচ





