আজ ২৭ মার্চ। এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিন দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোররাতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘আজ বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ। বৃহস্পতিবার রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ঢাকার রাজারবাগের পুলিশ ব্যারাক ও পিলখানায় ইপিআর সদর দফতরে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। ঢাকা মহানগরী ও অন্যান্য স্থানে অনেক নির্দোষ এবং নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একদিকে ইপিআর ও পুলিশ এবং অন্যদিকে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা অসীম সাহস নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করছে। স্বাধীনতার জন্য আমাদের লড়াইয়ে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন। জয় বাংলা।’
পূর্ব বাংলা রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের হয়ে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রচার করে, ফলে বিশ্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে জানতে পারে।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘On behalf of our great national leader, supreme commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman do hereby proclaim the independence of Bangladesh. It is further proclaimed that Sheikh Mujibor Rahman is sole leader of elected representatives of 75 million people of Bangladesh. I therefore appeal on behalf of our great leader Sheikh Mujibur Rahman to the government of all democratic countries of the world specially big world part and neighboring countries to take effective steps to stop immediately. The awful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan. The legally elected representatives of the majority of the people as repressionist, it is cruel joke and contradiction in terms which should be fool none. The guiding principle of a new step will be first neutrality, second peace and third friendship to all and anonymity to none. ─ May Allah help us, Jai Bangla.’
অনুবাদ : আমাদের মহান নেতা, বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের হয়ে আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। এটি আরও ঘোষণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একমাত্র নেতা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান। আমি সেই কারণে আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হয়ে বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিশেষ করে বৃহৎ বিশ্ব ও প্রতিবেশীদের কাছে কার্যকারী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হামলার ফলে ভয়াবহ গণহত্যা শুরু হয়েছে। অধিকাংশ জনগণের বৈধভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিপীড়নকারী, এটি একটি ক্রুর কৌতুক ও মিথ্যা অপবাদ যার কাউকে বোকা বানানো উচিত নয়। বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রধান পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রথম হতে হবে নিরপেক্ষতা, দ্বিতীয় শান্তি এং তৃতীয় সকলের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন ও কারো সম্বন্ধে অজ্ঞানতা নয়। ─ আল্লাহ্ সহায় হোক, জয় বাংলা।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সহ একাধিক সূত্র থেকে এই বার্তা পাওয়া যায় এবং সিআইএ এই বার্তা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে পাঠায়। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ (ইউএস ইস্টার্ন টাইম) এবং আরও পরে ওয়াশিংটন ডিসিতে উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সভায় সিদ্ধান্তের জন্য এ বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য বাল্টিমোর সান ও এলএ টাইমসসহ বিভিন্ন মার্কিন দৈনিকে এই খবর ছাপাও হয়। এ ছাড়া আমেরিকান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিবিএস এবং অন্য দুটি চ্যানেল এ খবর সম্প্রচার করে।
ভারতের বেশিরভাগ গণমাধ্যম বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার ও প্রকাশ করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ১টায় (২৫ মার্চ দিনগত রাত) পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতারের আগে ইপিআর, বর্তমান বিজিবি ওয়ারলেসের মাধ্যমে ওই বার্তা পাঠায়।
মার্কিন মহাজেফখানায় সংরক্ষিত ফাইল অনুযায়ী মুজিব ও ইয়াহিয়ার মধ্যে একটি সফল আলোচনার পরও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদক্ষেপে তারা বিস্মিত হয়। তাদের উপসংহার ছিল, ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে এই বিষয়টি গ্রহণ করাতে পারবে না। তাছাড়া এই আলোচনা ছিল সামরিক সমাবেশ ঘটানো এবং পূর্ব পাকিস্তানে ক্রাকডাইনের একটি ‘প্রলোভন।’
বিদেশি মিডিয়ায় খবর প্রকাশ:
সাইমন ড্রিং বা অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রথম পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিস্তারিত জানতে পারলেও ২৫ মার্চ কালরাত্রির ঘটনার খবর ২৭ মার্চই তাদের কাছে পৌঁছে যায়। বিশ্বখ্যাত বেশ কিছু পত্রিকা ২৭ মার্চ থেকে প্রতিদিনই পূর্ব-পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে।
ডেইলি টেলিগ্রাফ ছিল এদিক দিয়ে এগিয়ে। ২৭ মার্চ পত্রিকাটিতে ২৫ ও ২৬ মার্চের ঘটনা নিয়ে দু’টি সংবাদ ও একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘CIVIL WAR FLARES IN E. PAKISTAN: Sheikh ‘a traitor’ says President’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গতকাল (২৬ মার্চ) থেকে পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রটির এ প্রদেশে পূর্ব ও পশ্চিম পক্ষের এ সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন।’
এ ছাড়া ‘Jinnah’s dream of unity dissolves in blood’ শিরোনামের সংবাদ ও ‘PAKISTAN’S CIVIL WAR’ শিরোনামের সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার দ্য এজ-এ এদিন প্রকাশিত হয় ‘DECCA BREAKS WITH PAKISTAN’ শিরোনামের একটি সংবাদ।
এআইজে





