বাংলাদেশ ব্যাংক রির্জার্ভ চুরির যাওয়ার অনেক পরে টের পেলেও এখনো মুল হোতাদের গ্রেফতার এবং অর্থ উদ্ধার ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
উল্লেখ্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে হ্যাকাররা। এজন্য তারা বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারকে বেছে নিয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ থাকলেও শুক্রবার দিনটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কার্যদিবস ছিল।
ওই ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ ছাড় করতে সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে ভুয়া নির্দেশ পাঠায় হ্যাকাররা। পর পর কয়েকটি সন্দেহজনক পরিশোধ-আদেশ (পেমেন্ট অর্ডার) পাওয়ায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের জানানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছুটির দিন হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
টাকা উদ্ধারে টাস্কফোর্স গঠন
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া ৮০০ কোটি ফিরিয়ে আনতে সাত সদস্য বিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ টাস্কফোর্সকে সব ধরনের সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে।
বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
সাত সদস্যের টাস্কফোর্স কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানকে। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সি ইউনিট’-এর মহাব্যবস্থাপককে।
এ ছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সকে সকল ধরনের সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষিত টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। ফিলিপাইনের দৈনিক দ্য ইনকোয়েরারের হিসাব মতে, এর পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো কিছু না জানালেও বিদেশি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নেয়।
আদালতের নির্দেশ লাগবে
বাংলাদেশের রাজকোষ থেকে চুরি করা অর্থ বাংলাদেশের কাছে ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ লাগবে। আদালত নির্দেশ দিলেই ক্যাসিনো জাঙ্কেট অপারেটর কিম ওংয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা টাকা তুলে দেয়া হবে বাংলাদেশের কাছে। এ কথা বলেছেন ফিলিপাইনের সিনেট ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তিওফিস্তো গুইঙ্গোনা তৃতীয়।
তিনি বলেছেন, কিম ওংয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) একটি সিভিল ফোরফিচার (বাজেয়াপ্তকরণ) মামলা করবে। মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এএমএলসি। এ সময় এএমএলসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন গুইঙ্গোনা।
পরে তিনি ফিলিপাইনের এনকোয়ার পত্রিকাকে ফোনে বলেছেন, আমরা সর্বশেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। তাহলো এ বিষয়ে একটি মামলা করা হবে। এটা আইনী প্রক্রিয়া। আমাদেরকে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। তার কথায়, সরকারের একটি সংস্থা থেকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এই অর্থের মালিক বাংলাদেশ এবং তাদের হাতে তা ফেরত দিতে হবে এই মর্মে একটি নির্দেশনা প্রয়োজন।
গুইঙ্গোনা বলেন, যখনই আদালত থেকে এমন নির্দেশনা দেয়া হবে তখনই এএমএলসি ওই অর্থ বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে। সিনেটর গুইঙ্গোনা বলেন, এরই মধ্যে বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত জন গোমেসকে এ অর্থ ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। জবাবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেই তিনি এই অর্থ ফেরত নেবেন।
এখন পর্যন্ত কিম ওং বাংলাদেশের চুরি করা অর্থ থেকে ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং ৩ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার পেসো ফেরত দিয়েছেন কর্তৃপক্ষের কাছে। আগামী ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আরও ৪৫ কোটি পেসো ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিম ওং বলেছেন, তিনি ওই অর্থ ক্যাসিনো অপারেটর হিসেবে পেয়েছিলেন। তবে তিনি এক্ষেত্রে দু’চীনা নাগরিকের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন, তাদের কাছ থেকে তিনি এসব অর্থ পেয়েছেন। তবে বাংলাদেশের এই অর্থ ফেরত পেতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে দাবি করেছেন সিনেট ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান গুইঙ্গোনা।
তিনি বলেন, যেহেতু এ নিয়ে মামলা হলে তাতে কোন প্রতিপক্ষ থাকবে না, তাই এ মামলার সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে ওই সময়ের মধ্যেই। তিনি বলেন, সাধারণত এসব মামলা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে। কারণ, তাতে প্রতিপক্ষ থাকে। যদি কেউ দাবি করে বসেন যে, এই অর্থের মালিক বাংলাদেশ নয়, তিনি এর মালিক। তাহলে এ মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমনটা দাবি করার মতো কেউ নেই।
তথ্য দেয়নি এফবিআই
তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে আলামত সংগ্রহ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নেয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় কোনো তথ্য দেয়নি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
ব্যাংকের কারা কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করতেই এফবিআই এসব আলামত সংগ্রহ করে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহেল বাকি বলেন, যেকোনো দেশে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে এফবিআই তদন্ত করে। এজন্য তাদের কাছে কোনো আবেদন করতে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপারেও তারা স্বেচ্ছায় এসে তদন্ত করেছে। তবে এরপর তারা আর কোনো যোগাযোগ করেনি।
এফবিআই ছাড়াও পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে তাদের জন্য তদন্ত থেমে নেই। অপরাধী যারাই হোক তাদের গ্রেপ্তার করে আইনে সোপর্দ করা হবে।
হ্যাকাররা রিজার্ভ লুটের পর সিআইডিসহ সরকারের একাধিক সংস্থা তদন্তে নামে। তারই ধারাবাহিকতায় উৎস খুঁজে পেতে এফবিআইয়ের কাছে আইটি ফরেনসিক সহযোগিতা চায় সিআইডি।
চুরি যাওয়া টাকা কাদের কাছে গেছে তা বের করতেও সাহায্য চাওয়া হয়। এরপর এফবিআইয়ের এক কর্মকর্তা সিআইডির কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো অর্থ চুরির ঘটনা ঠেকাতে সিআইডি ও এফবিআই এক সঙ্গে কাজ করার বিষয়েও সম্মত হয়।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে এফবিআই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আলামত সংগ্রহ করছে। এফবিআই এজেন্টরা অর্থ আত্মসাতের ঘটনার পেছনে কারা ছিল, তা জানার চেষ্টা করছে।
গণশুনানি চায় সিপিডি
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রিজার্ভ চুরির টাকা ফিলিপাইনে যাওয়ায় সেখানে সিনেট কমিটির তদন্ত হলেও বাংলাদেশে তেমন কোনো উদ্যোগ কেন নেয়া হয়নি।
ফিলিপাইনের পার্লামেন্টে সিনেট বৈঠক করলো, আমাদের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি একটি মিটিং ডাকলো না কেন? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিচালন ব্যবস্থায় কোথাও ‘অসঙ্গতি’ আছে কিনা তা ‘খতিয়ে দেখার সময় এসেছে’। আর এটা নিয়ে উন্মুক্ত শুনানি হওয়া উচিত। আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রস্তাব দেন তিনি।
পানামা পেপার্স নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টি আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। আন্ডার ইনভয়েস, ?ওভার ইনভয়েস ছাড়াও বিদেশে বিনিয়োগের নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, তবে পাচার প্রতিরোধে অবৈধ সম্পদ ও আয় এগুলোকে একটা আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং এগুলোকে মূল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতিতে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বলে একটা বিষয় আছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করার মতো সদিচ্ছা ও মনোবল সরকারের আছে কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি যাওয়ার এক মাস পর তা বিদেশি গণমাধ্যম থেকে প্রকাশিত হওয়ার প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, দেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি ‘বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি’ বিরাজ করছে।
তাই কি হচ্ছে তদন্ত বা কখন কিভাবে টাকা ফেরত আসছে এর উপরে গণ শুনানি হওয়া দরকার।
গণ শুনানি হলে এ ব্যপারে সচেতনতা বারবে এবং ভবিষ্যতে আর এ ধনণের ঘটনা থেকে সবাই সজাগ থাকবে।
ফলোআপঃ
১৬ কোটি মানুষের একটাই প্রশ্ন আমাদের দেশের কষ্টার্জিত সম্পদ কারও সামান্য ভুলের জন্য লোপাট হয়ে যাবে এটা কেউই মেনে নিতে পারছে না। এই অর্থ ফেরত আনার জন্য সকল ধরনের চেষ্টা চালানোর জন্য সরকারের প্রতি আহব্বান জানান।
বিদেশী যারা এই অপকর্মের সঙ্গে জরিত তাদের দূত গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করে শাস্থি চান বাংলার মানুষ।
এমআর





