১৯৭১ সালের ঘটনা। সেদিন ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর। ভোরের আভা ছাড়িয়ে তখনো সূর্যের রক্তিম আলোর দেখা মেলেনি। গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে আছেন। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরেই তারা জেগে উঠবেন। ঘরির কাটা তখন ৪টা এবং ৫টার মাঝামাঝি কোন এক স্থানে। এমনই এক সময় পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্প থেকে ১টি স্পিডবোট ও ৮ থেকে ১০টি বাওয়ালী নৌকা নিয়ে আসে ১০ থেকে ১৫ জনের হানাদার বাহিনী।

তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, লাখাই উপজেলার মুড়াকরি গ্রামের লিয়াকত আলী, বাদশা মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউকের আহাদ মিয়া, বল্টু মিয়া, কিশোরগঞ্জের লাল খাঁ, রজব আলী, সন্তোষপুরের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়ার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একদল রাজাকার-আলবদর।

তারা সোজা গিয়ে প্রবেশ করে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার হিন্দু অধুষ্যিত কৃষ্ণপুর। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামটিতে তাদের প্রবেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। তবে তখনো কেউ আঁচ করতে পারেননি যে, তারা কতটা ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। সেদিনের ঘটনা যারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তারা আজও সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে ওঠেন। তাদের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে সেদিনের নৃশংসতা।

প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কৃষ্ণপুর গ্রামটি একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। যে কারণে হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক হিন্দু কৃষ্ণপুর ও কৃষ্ণপুরের হাটি চণ্ডিপুর, সিতারামপুর, গদাইনগর, গঙ্গানগর, গোকুলনগরে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি।

সেদিন পাক বাহিনী অন্তত ১২৭ জন পুরুষকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। পরে আগুন দিয়ে গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় ও লুটপাট চালায়। এ ছাড়া গ্রামের নিরীহ নারীদের সম্ভ্রম হরণ করে। এ হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে।

হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছের একটি মজা পুকুরে কচুরিপানার নিচে আশ্রয় নেন। হানাদাররা চলে গেলে তারা হত্যাযজ্ঞ স্থল থেকে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গ্রাম ত্যাগ করেন।হানাদারদের গুলি খেয়ে মৃতের ভান করে মাটিতে পড়ে থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন প্রমোদ রায়, নবদ্বীপ রায়, হরিদাস রায় ও মন্টু রায়।

স্বাধীনতার অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার না পেয়ে হতাশ অনেকেই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই দিন হানাদার বাহিনীর চেয়ে রাজাকার, আলবদরের সংখ্যাই বেশি ছিল। তারা ক্ষোভের সাথে জানান স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কৃষ্ণপুরের নিহতরা আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি।

গ্রামবাসীর প্রাণের দাবি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও হবিগঞ্জ জেলার বৃহত্তম গণহত্যার নিদর্শনীয় স্থান কৃষ্ণপুর বধ্যভূমিটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গরূপে সংস্কার করে নিহত শহীদের মর্যাদা দিতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

ওই দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রভাত রায় (৬৬) বলেন, ‘হত্যাযজ্ঞের দিন পাক বাহিনীর চেয়ে রাজাকার, আল বদরের সংখ্যাই বেশি ছিল। তারা ফায়ার করবে কখনও ভাবিনি। প্রথমেই তারা রামাচরণ রায়কে গুলি করে হত্যা করে। এ দৃশ্য দেখে আমিসহ অন্যান্যরা মজাপুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে প্রাণে রক্ষা পাই।’

অপর প্রত্যক্ষদর্শী গোপালকৃষ্ণ রায় জানান, গ্রামটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে হিন্দুরা এসে আশ্রয় নেন। এ খবরটি রাজাকারদের মাধ্যমে পাক বাহিনী জেনে যাওয়ার পরই তারা হামলা চালায়।

তিনি আরও জানান, ওই দিন নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে হানাদারদের গুলিতে নিহতদের মৃতদেহের সৎকার না করে স্থানীয় বলভদ্র নদীতে ফেলে দিয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান।তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের এতগুলো মানুষ প্রাণ হারালো, নারীরা হারালো সম্ভ্রম, এত কিছুর পরও কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না।’

এ ব্যাপারে যুদ্ধাহত প্রমোদ রায় (৭৫) বলেন, যুদ্ধের সময় ও এর আগে তিনি ব্যবসা করতেন। কিন্তু গুলি খেয়ে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি পঙ্গুত্ব নিয়ে চলাফেরা করছেন। দৈনন্দিন কোন কাজ করতে পারেন না। ওই দিনের পর থেকে এলাকার লোকজনের সাহায্যেই তিনি চলাফেরা করছেন।

এদিকে, গণহত্যার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় বাদী হয়ে লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ১১ আগস্ট হবিগঞ্জে বিচারিক হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন।

ওই মামলাটি ২০১০ সালের ১২ আগস্ট সিলেট বিভাগে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা হিসেবে ট্রাইব্যুনালে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে মামলাটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ ও তদন্ত কর্মকর্তা, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মনোয়ারা জাহানের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতিনিধি দল কৃষ্ণপুর গ্রাম পরিদর্শন করেছেন।

পরিদর্শনকালে তারা ওই মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়াও এলাকার বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন।তিনি আরও বলেন, ‘ওই দিন রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী ১২৭ জনকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। এর মধ্যে ১১৭ জনের নাম পাওয়া যায়। বাকিদের সনাক্ত করা যায়নি।’

এআর