ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় ধাপেও সারাদেশে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও জালভোট দেয়ার পর গায়েবী ফলাফল নিয়ে সারাদেশে তুমুল সহিংসতা চলছে। সহিংসতায় ইসি ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তা নিয়ন্ত্রণে ইসির কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।যা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তৃতীয় ধাপের নির্বাচনি সহিংসতায় এ পর্যন্ত একজন প্রার্থীসহ ৭ জন নিহত ও তিন সতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউপি নির্বাচনে সরকারিদলের নজিরবিহীন সহিংসতায় মোট ৬৪ জন নিহত হয়েছে। পুলিশের সামনেই ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকায় সীল মেরে সারাদেশেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুল বিজয় লাভ করেছে।

তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত দেশের ২১ জেলার ৬১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ৩৫৩, বিএনপির ৫২, জাতীয় পার্টির ১২, স্বতন্ত্র ১৩৫ ও অন্যান্য দলের ৩ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এ ধাপের নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনীর গুলিতে পাবনায় একজনের মৃত্যুসহ ৭ জন নিহত, সহিংস সংঘাতে পুলিশসহ আহত হয়েছে তিন শতাধিক মানুষ।

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা চলছে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, ভৈরববাজার, ফরিদপুরের মধুখালী, শ্রীপুর, হবিগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মাগুরা, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, পার্বতীপুর, লামাসহ দেশের অধিকাংশ জেলায়।

পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী দুই ধাপের মতো ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও অস্ত্রের মহড়া, হামলা, প্রতিপক্ষের এজেন্ট বের করে দেয়া, ভোটারদের বাধা দেয়া এবং প্রার্থীদের ভোট বর্জনসহ অন্যান্য অনিয়মের কোনো হেরফের ঘটেনি। নৈরাজ্য-অরাজকতার এ পুনরাবৃত্তি সত্যিই দুঃখজনক বলে মনে করা হয়।

উল্লেখ্য, ৬ ধাপে অনুষ্ঠেয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয় গত ২২ মার্চ। প্রথম ধাপের নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে, আহত হয় ৮ শতাধিক মানুষ। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ৩১ মার্চ। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনকেও ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ বলে অভিহিত করে বিএনপি।

দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তিন ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘর্ষে ৬৪ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মূলত তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে জনমনে যে সংশয় ও আশংকা দানা বেঁধেছিল- অন্তত নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ পর্যন্ত তা সত্যে পরিণত হয়েছে- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর শাসক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হলেও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সেটা গুড়েবালি বলে প্রমাণিত হয়েছে।

দেশে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ নির্বাচনে সহিংসতার আশংকা বিগত দিনের নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন দেশের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। বস্তুত ভোট গ্রহণের অনেক আগে থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও দুষ্কর্মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল।

ইউপি নির্বাচনে এবার বেশি সহিংসতার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্যায় করলে যদি ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে অনেকেই উৎসাহিত হয়। আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনদের জন্য সাতখুন মাফ হয়ে যায়। অনেক সময় অন্যায়কারীরা পুরস্কৃতও হন।

ফলে এ ধরনের নির্বাচনে সহিংসতা ঘটাতে কেউ দ্বিধা করছে না। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে সংঘাত এমন মাত্রা ছাড়া। আর দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছে ইউপিতে নির্বাচিত হওয়া মানে সরকারে থাকার ফায়দা লোটা। তাই সবাই এমন মরিয়া। এ অবস্থায় সহিংসতা অবশ্যম্ভাবী।

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘বায়েস্কোপ’ দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেছেন, প্রহসনের নির্বাচনে প্রতিনিয়তই প্রাণ ঝরছে। এখনও নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। মানুষকে মেরে হত্যা করে সবাই নির্বাচিত হচ্ছেন। এ নির্বাচন দেখে আমারও লজ্জা লেগেছে। জানি না, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের লজ্জা লেগেছে কিনা।

২৪-০৪-১৬ তারিখ দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে এক অনুষ্ঠানে নোমান বলেন, এর আগে ছোট বেলায় মার কাছ থেকে আট আনা নিয়ে যে বায়োস্কোপ দেখেছিলাম, আজকে নির্বাচনের নামে একই দেখছি। বায়োস্কোপে ছিল, ‘আখার দেখ-বাখার দেখ জার্মানির যুদ্ধ দেখ।’ আজকে নির্বাচনের নামে বন্দুক নিয়ে লড়াই দেখছি। এমন কোনো ভোটকেন্দ্র দেখেনি, যেখানে যুদ্ধ হয়নি। এটা একটি প্রহসন ও ডাকাতির নির্বাচন। এই নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যাবে না।

তিনি বলেন, আমরা ইসিকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, ভোটের আগে যেখানে গুন্ডারা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেবে, সেখানকার নির্বাচন বন্ধ করতে হবে। এতে করে সন্ত্রাসীরা আর ভোটকেন্দ্র দখলের চিন্তা করবে না। কিন্তু আমরা কি দেখছি? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের একটি কেন্দ্রও নেই, যেখানে বন্দুকযুদ্ধ হয়নি। চর দখলের মতো ভোটকেন্দ্রও দখল হয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়ম ও সহিংসতা এবং এতগুলো মানুষের আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো। ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ নির্বাচন কমিশনের সামনে ছিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, কমিশন এ সুযোগ কাজে লাগাতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ কথা সত্য, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। নির্বাচনে প্রতিটি অনিয়ম-বিশৃংখলা এবং পর্দার অন্তরালে সংঘটিত সব ঘটনার সমাধান দেয়া অতি দুরূহ কাজ। তবে মোটা দাগে অনিয়ম ও আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা রোধ করা অসাধ্য কিছু নয়।

নির্বাচন কমিশন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হলে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা বলতে কিছু আর অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা আশা করব- নির্বাচন কমিশন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সংঘটিত অনিয়ম ও সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

এমই