“ভাইয়া আমাকে খুব শাসন করতো। আদরও করতো। বলতো আমি তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারিনি। তোকে কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে। সেভাবেই পড়াশুনা কর। ভাইয়া ফিরে আসার অপেক্ষায় আছি। আমি ওয়াদা করছি,ভাইয়া তুই ফিরে আয়। আমি তোর কথা রাখবো।”
কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ইশতিয়াক বিন মাহমুদ উদয়ের ছোট ভাই তাওসিফ বিন মাহমুদ। তাওসিফ বিন মাহমুদ ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেনীতে পড়ছে।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে গত ১৪ এপ্রিল আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ ছাত্র সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে যায়। দুপুরে জোয়ারে টানে ভাটার জলে ভেসে যায় ৯ ছাত্র। এদের মধ্যে ৪জনকে মৃত ও ৩ জনকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো নিখোঁজ দু’জন ছাত্র। এদের মধ্যে ইশতিয়াক বিন মাহমুদ উদয় একজন। অপরজন হলো সাব্বির হাসান।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে,নিখোঁজ উদয় ও সাব্বিরকে সাগরে রেখেই গত রোববার সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে কোস্টগার্ড। ওই দুই ছাত্রের উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ায় এ ঘোষণা দিয়েছে কোস্টগার্ড।
উদয়ের ছোট ভাই তাওসিফ বলেন,‘ভাইয়াকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে ভাইয়া। কিন্তু ঘুরতে গিয়ে এভাবে যে ভাই নিখোঁজ থাকবে ভাবতে পারছি না। ’
তাওসিফ বিন মাহমুদ বলছেন,ছোট ভাই তাসলিম আর মা খুব ভেঙ্গে পড়েছে। শান্তনা কি দেব? ভাইয়া তো ফিরে আসছে না!
উদয়ের ছোট ভাই তাসলিম বিন মাহমুদ নীরব। কোনো কথা নেই। চুপচাপ। ভাইয়ের ছবি বুকে চেপে হঠাৎ হাউমাউ করে কান্না। তাসলিমের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে ফেনির জেলা সদরের গাজীবাড়ি।
নিখোঁজ উদয় বাবা মার সাথে ঢাকার বাসাবোর মায়াকাননে একটি বাসায় থাকতেন। বাবা মাহমুদউল্লাহ গাজী অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি কর্মকর্তা। মা দিল আফরোজ বেগম কমলাপুর স্কুলের শিক্ষিকা। উদয়দের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলা সদরের ১নং শৌর্সুদী ইউনিয়নের গাজী বাড়ি।
কথা হয় উদয়ের বাবা মাহমুদ উল্লাহ গাজীর সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন,“আমার ছেলে ধর্মভীরু। নিয়মিত নামাজ পড়তো। ঢাকার বাসাবো এলাকার মায়াকাননে ২৪টি বছর কেটেছে উদয়ের। মায়কাননের অলিগলিতে ওর স্মৃতি জড়িয়ে। নিখোঁজের পর থেকে পুরো এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। শেষ ভরসা আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও উদয়কে যেন আল্লাহ ফিরিয়ে দেন।”
উদয়ের বাবা মাহমুদ উল্লাহ গাজী টাইম নিউজবিডিকে বলেন,আমার তিন ছেলের মধ্যে উদয় বড়। মেঝো ছেলে তাওসিফ বিন মাহমুদ ঢাকা কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। ছোট ছেলে তাসলিম বিন মাহমুদ মায়ের প্রতিষ্ঠানে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। উদয় সবার মধ্যে বেশি মেধাবী।
তিনি বলেন,উদয়ের বন্ধুদের সাথে সহৃদ সম্পর্ক ছিল। যেদিন ওরা সবাই সেন্টমার্টিনে যায় সেদিন রাতেও ওরা ৯/১০ জন আমার বাসায় ছিল। আরেক নিখোঁজ ছাত্র সাব্বিরের সাথে উদয়ের ভালো বন্ধুত্ব ছিল বলেও জানান তিনি।
মাহমুদ উল্লাহ গাজী বলেন,“চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছি। বড় ছেলে উদয় ছিল শেষ ভরসা। ভেবেছিলাম ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ভালো একটা চাকুরি করবে। তখন আর কোনো অভাব থাকবে না। কিন্তু সে আশায় নিরাশায় পরিণত হয়েছে। আমার স্বপ্ন আমার ছেলে। কোনোভাবে ভাবতে পারছি না উদয় এভাবে ভাটার টানে সাগরে হারিয়ে যাবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“প্রধানমন্ত্রী তো প্রায়ই বলেন,তিনি স্বজন হারানো ব্যথা বোঝেন! সেন্টমার্টিনের যে জায়গায় ছেলেরা ডুবে গেলো সেখানে এরআগেও অনেক মৃত্যুর খবর জেনেছি। তবে কেন সরকার সেখানে প্রাণহানি যাতে আর না ঘটে সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি?
তিনি বলেন,আন্তর্জাতিক একটি পর্যটনস্থানে যে পরিমাণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার সরকার এর কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারে নি। যার কারণে প্রায়ই সেখানে পর্যটকরা ঘুরতে গিয়ে লাশ হচ্ছেন। সাগরে হারিয়ে যাচ্ছেন। এর দায় কোনোভাবে সরকার এড়াতে পারে না। সেখানে শুধু কয়েকটি মৃত্যু নয় সরকারের অবহেলায় কয়েকটি পরিবারের স্বপ্নেরও অপমৃত্যু ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন,আমি আশায় বুক বেঁধে আছি। আমার ছেলে মরে যায় নি। উদয় ফিরবে এই ভেবে দিন রাত আল্লাহকে ডাকছি। এখন আল্লাহ ছাড়া ভরসার কেউ নেই। আল্লাহ চাইলে আমার ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারে।
অক্ষত অথবা মৃত যেভাবেই হোক না কেন নিখোঁজ দুজনকে ফিরিয়ে আনতে সরকার যেন তল্লাশী অভিযান অব্যাহত রাখে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানান তিনি।
[b]ঢাকা,জেইউ,২১ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ
[/b]
টাইম ফোকাস
ভাইয়া ফিরে আয়,আমি কথা রাখবো
“ভাইয়া আমাকে খুব শাসন করতো। আদরও করতো। বলতো আমি তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারিনি। তোকে কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে। সেভাবেই পড়াশুনা





