আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিশ্ব বেতার দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও যথাযথভাবে পঞ্চম বারের মতো পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব বেতার দিবস।’ দিবসটি উদযাপনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে একটি অনুসরণীয় মডেল দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হচ্ছে। এতে অংশ নেয় বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিওগুলো।

অনেকেরই ধারণা ইন্টারনেটের অগ্রযাত্রার এই সময়ে রেডিও তার গুরুত্ব হারিয়েছে। ধারণাটি সঠিক নয় মোটেই। কারণ সময় যেমন বদলেছে, ঠিক তেমনই সময়ের সঙ্গে তালমিলিয়ে প্রচারণার ধরণও বদলে গেছে। এখনও মানুষ রেডিও শোনে। এখনও রেডিওর ওপর নির্ভর করে অনেক মানুষ।

সারাবিশ্বে বেতার এখনও অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম। বেতারের রয়েছে পৃথিবীর দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর শক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের ফলে সম্প্রচার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। বিশ্ব বেতার দিবসের বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বেতারের বিরামহীন সম্প্রচার মানুষকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেয়।

মহান স্বাধীনতাযুদ্ধেও বেতারের ছিল গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ বেতারের সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কলাকুশলীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।’

বিশ্ব বেতার দিবসের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণে গণমানুষকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে বেতার শক্তিশালী হাতিয়ার।

এ ছাড়াও জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ সম্পাদন করা এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় বেতারের ভূমিকা অনন্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নতুন প্রযুক্তি বেতারকে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলছে।’

বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী এএইচএম বজলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি রেডিওগুলোর মূল প্রভাব হলো জনগণের দোরগোড়ায় স্থাপিত এই গণমাধ্যম দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের কথা সরাসরিভাবে বলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তৈরি হয়েছে কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর সোচ্চার করা ও শোনার সুযোগ।

তিনি আরও বলেন, এই নতুন গণমাধ্যম সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে পল্লী অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে তথ্য এবং যোগাযোগের অধিকার এনে দিয়েছে।

এ মুহূর্তে আরও অন্তত ৫০-৬০টি কমিউনিটি রেডিওর আনুমোদন দিলে গ্যাপ এলাকা যথা মিডিয়া ডার্ক এলাকাগুলো কমিউনিটি রেডিওর আওতায় আসবে বলে তিনি মনে করেন।

দেশে এখন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিযোগিতাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। গ্রামগঞ্জ ও দুর্গম এলাকায় এখনও বেতার তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম। আগামীর বাংলাদেশ হবে রেডিও’র বাংলাদেশ। সরকার ইতিমধ্যে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ বেতার ১২টি আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র এবং ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে। আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দারবান ও কুমিল্লা।

এছাড়া অনুষ্ঠান প্রচারে ইউনিটগুলো হচ্ছে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস, বহির্বিশ্ব কার্যক্রম, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেল এবং ট্রাফিক সম্প্রচার কার্যক্রম।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) ২০০০ সালে থেকে বাংলাদেশে গ্রামীণ জনপদে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উন্নয়নমূলক তথ্য ও জ্ঞান বিনিময়ের পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি সেবা, জীবনঘনিষ্ঠ যাবতীয় তথ্য জনগণের মাঝে সহজ ভাষায় প্রচারের লক্ষ্যে কমিউনিটি রেডিও চালু করতে সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করে আসছে।

দেশে বর্তমানে ১৬টি কমিউনিটি রেডিও প্রতিদিন ১২৫ ঘণ্টারও বেশি সময় অনুষ্ঠান সমপ্রচার করছে। ১ হাজার তরুণের অংশগ্রহণে নতুন ধারার এ গণমাধ্যমটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

১৪টি জেলার ৬৮টি উপজেলার প্রায় ৫৫ লাখ জনগোষ্ঠী কমিউনিটি রেডিওর সুবিধা ভোগ করছে বলে জানিয়েছে বিএনএনআরসি। কমিউনিটি রেডিও স্টেশন পর্যায়ে ৫ হাজার ‘শ্রোতা ক্লাব’ গঠিত হয়েছে শ্রোতাদের সমন্বয়ে।

এদিকে তথ্য মন্ত্রণালয় কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সমপ্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি ও সদিচ্ছার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশ হচ্ছে কমিউনিটি রেডিও বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নকারী দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ। তথ্য মন্ত্রণালয় ১৬টি কমিউনিটি রেডিওর সঙ্গে আরও ১৬টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। বিএনএনআরসি আশা করছে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ১৬টি কমিউনিটি রেডিও সমপ্রচারের কাজ শুরু করবে।

বাংলাদেশ বেতারের জন্মকালের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে এক ঐতিহাসিক মিল। বাংলাদেশে বেতারের যাত্রা শুরু ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এর ঠিক ৩২ বছর পর এ দিনটিতেই চূড়ান্ত বিজয় লাভের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয় বাংলাদেশ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বেতার ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিহার্য সঙ্গী। বাংলাদেশ বেতার মুক্তিযুদ্ধে দেশে বীর সেনাদের অন্যতম এক অনুপ্রেরণার মাধ্যম। সে বেতার আজ ৭৭ বছরে। সে এক বিরাট সাফল্য গাঁথা বৈকি। বিশ্বে প্রথম রেডিও আবিষ্কারই হয়েছিল ১৮৯৮ সালে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ঢাকা বেতার কেন্দ্র। যুদ্ধের সময় এটি হয়ে যায় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। আর সাফল্যের পর সাফল্যের খবর শুনিয়ে সহজেই কেড়ে নেয় মুক্তিকামী মানুষের মন।

মানুষের জীবনে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রকৃত বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ বেতার। এখনো অবিরাম তথ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ বেতার।

রেডিও এখন শাখা-প্রশাখায় অনেক বিস্তৃত। মূলত চারটি ধারায় রেডিও সম্প্রচার করে থাকে, যথা: পাবলিক সার্ভিস, আন্তর্জাতিক রেডিও, বাণিজ্যিক রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিও।

পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ বেতার যেমন অনুষ্ঠান ও খবর সম্প্রচার করছে; তেমনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকা, এন এইচ কে, রেডিও তেহরান, রেডিও চায়না ও অন্যান্য বিদেশি মাধ্যমেও বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারছি।

আবার দেশে সাম্প্রতিক কালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সম্প্রচার করছে শহরভিত্তিক বেসরকারি এফএম রেডিও। সব মিলিয়ে রেডিওর প্রচার দিনে দিনে প্রসারিত হচ্ছে।

এমকে