পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো আজকের দিনে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে কড়া সামরিক পাহারায় ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া ভুট্টোকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে আর কেউই উপস্থিত ছিলেন না। ভুট্টোর এই আগমনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার মধ্যে বিক্ষোভের আগুন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পিপিপি নেতা ভুট্টো অবস্থান করেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান শেরাটন)।

এই খবরে হোটেলের চারদিকে অসংখ্য মিছিল নিয়ে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা ভিড় করে। মিছিলে মুহুর্মুহু স্লোগান ওঠে- ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম-সংগ্রাম; বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর; তোমার-আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা; জয়বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু।’ এদিনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন আহমদ তাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে যান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করতে। বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। এদিনও একমাত্র প্রেসিডেন্ট ভবন (আজকের সুগন্ধা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন) এবং ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া দেশের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত ছিল না।

ঢাকাসহ সারা দেশেই স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত অসংখ্য পতাকা শোভা পাচ্ছিল। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে যখন প্রেসিডেন্ট ভবনে যান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য, তখনই স্পষ্টত দেশটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর দুই দেশের দুই নেতার এ বৈঠক কেবলই যে আনুষ্ঠানিকতা এবং কালক্ষেপণের, সে বিষয়টিও আলোচিত ছিল সর্বত্র। বৈঠক শেষে এদিনও বঙ্গবন্ধু উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগের কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য আজকের বৈঠকের প্রয়োজন ছিল।

এদিকে আগের দিনে গাজীপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাঙালি সেনাবাহিনী ও বিক্ষুব্ধ জনতার ব্যাপক সংঘর্ষের খবরে সারা দেশের সংগ্রামরত মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। তাদের সাহস বহুগুণে বেড়ে যায়। সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, অস্ত্র সংগ্রহ এবং গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বাঙালি সেনা সদস্যরাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। এদিন বাঙালি সেনা সদস্যরা অসীম সাহসের পরিচয় দেয়। তারা গোপনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সংঘবদ্ধ হয়। তারা এদিন আরও একটি বিশেষ ঘটনা ঘটিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সমবেত হয়ে কর্নেল (অব.) ওসমানীর নেতৃত্বে সশস্ত্র কুচকাওয়াজ করেন। কয়েকশ’ বাঙালি অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার জন্য দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। পল্টন ময়দানে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয় এবং তাদের ঘোষণাকে স্বাগত জানায়। বিকালে পাকিস্তান মুসলিম লীগ নেতা মিয়া মোহাম্মদ দৌলতানা ও পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা মুফতি মাহমুদ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির বাসভবনে যান।

মিয়া দৌলতানা ও মুফতি মাহমুদ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাবাহী গাড়িতে করে হোটেলে ফেরেন। পথে পথে তারা লক্ষ্য করেন, হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, কিশোর-যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষের স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত করা মিছিল। পাকিস্তানের এই দুই রাজনৈতিক নেতা হোটেলে সাংবাদিকদের কাছে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় জানান, গোটা পূর্ব পাকিস্তান এখন শেখ মুজিবের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের ২০তম দিবসেও টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হচ্ছিল। কোথাও এতটুকু বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। কারণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করার জন্য স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৩৫ দফা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হতে থাকে সমগ্র দেশেই। চলতে থাকে সশস্ত্র যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতিও।

এআইজে