বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রফতানি-২ শাখা থেকে জারি করা নির্দেশনামূলক এক বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদন পাওয়া রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে যাবতীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত কোটা ও প্রকৃত রফতানির বড় ব্যবধান

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দেশীয় বাজারে সুগন্ধি চালের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং স্থানীয় জনগণের চাহিদা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই আলোকেই পূর্বে দেওয়া রফতানি অনুমোদনের পরিমাণ হ্রাস বা সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রকৃতপক্ষে কতটুকু চাল রফতানি হয়েছে, তার নির্ভুল ও বাস্তব তথ্য সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদন পাওয়ার পরও যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের বরাদ্দকৃত কোটা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল রফতানি করতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা আংশিক রফতানি করেছে, তাদের অব্যবহৃত কোটা বাতিল বা সমন্বয়ের আওতায় আনা হবে।

উল্লেখ্য, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে সুগন্ধি চাল রফতানির সুযোগ দেয় সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় ১৩ মে ২১১টি এবং দ্বিতীয় দফায় ৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়। সর্বসাকুল্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও চালের বাজার পর্যবেক্ষণ

এর আগে গত ২ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সুগন্ধি চালের সামগ্রিক বাজার ও রফতানি পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশে সুগন্ধি চালের মোট উৎপাদন, প্রকৃত বাজার চাহিদা, বর্তমান খুচরা ও পাইকারি মূল্য এবং রফতানির সার্বিক চিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।

ওই বৈঠকেই বের হয়ে আসে যে, চাল রফতানির অনুমতি পাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত কোটার পুরো চাল বিদেশে পাঠাতে পারেনি। কেউ অল্প কিছু পাঠিয়েছে, আবার কেউ একেবারেই পাঠায়নি। ফলে সরকারি কাগজে-কলমে যে পরিমাণ চাল রফতানির অনুমোদন দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে কম চাল দেশ থেকে বের হয়েছে। এ কারণে কাগজে-কলমের অনুমোদন আর প্রকৃত রফতানির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

মিল মালিকদের সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ

বাজারের এমন টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে চাল ব্যবসায়ীদের একাংশ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য ও অভিযোগ উঠে এসেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় রাইস মিল মালিকের হাতে এখন বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চালের অবৈধ বা অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। তাঁরা পর্যাপ্ত চাল বাজারে না ছেড়ে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ সংকট তৈরি করছেন, যার ফলে চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

এই সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু মুনাফা লোটার কৌশল ভেস্তে দিতে কড়া নজরদারির ঘোষণা দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর যৌথ সমন্বয়ে শিগগিরই বাজার মনিটরিং ও তদারকি অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের মূল লক্ষ্য

আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে রফতানিকারকদের পাঠানো তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে রফতানি কোটা ছাঁটাইয়ের বিষয়ে মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য দুটি—প্রথমত, দেশীয় বাজারে সুগন্ধি চালের সরবরাহ নিশ্চিত করে দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনা, এবং দ্বিতীয়ত, কেবল প্রকৃত ও সক্ষম রফতানিকারকদেরই ব্যবসার সুযোগ অব্যাহত রাখা।

এমএম