দুই দেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপমন্ত্রী চিউ চুন মান অংশ নেন।
বুধবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পর্যটন খাতে সহযোগিতার বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
আকাশপথে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ
পর্যটন বিকাশে সরাসরি ও সহজ যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে দুই দেশ। এ কারণে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিমান চলাচলের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ বাড়লে পর্যটক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভ্রমণ করেন। একইভাবে মালয়েশিয়ার নাগরিকদের মধ্যেও বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ঘিরে আগ্রহ তৈরির সুযোগ রয়েছে। ফলে বিমান যোগাযোগের সম্প্রসারণকে শুধু পর্যটন নয়, দুই দেশের সামগ্রিক জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সহজ হতে পারে ভিসা প্রক্রিয়া
পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও সময়সাশ্রয়ী করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আগাম যাচাই বা প্রি-স্ক্রিনিং ব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভিসা প্রক্রিয়া যত সহজ ও স্বচ্ছ হবে, বৈধ পর্যটকের সংখ্যা তত বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে আগাম যাচাই ব্যবস্থা চালু বা শক্তিশালী করা গেলে ভ্রমণকারীদের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও ব্যবস্থাপনা সহজ হবে।
দুই দেশের পর্যটন খাতকে আরও গতিশীল করতে ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সহজ করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত কর্মীদের জন্য সম্ভাবনা
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মালয়েশিয়ার পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর আলোচনা। মালয়েশিয়ার পর্যটন সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, অতিথিসেবা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে এসব খাতে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা গেলে একদিকে দেশের কর্মীদের জন্য বৈধ ও দক্ষতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে, অন্যদিকে মালয়েশিয়ার পর্যটন শিল্পও প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে উপকৃত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মানকে আরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের অভিজ্ঞতা ও সর্বোত্তম অনুশীলন বিনিময়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।
অভিজ্ঞতা বিনিময়ে জোর
পর্যটন খাতে কোন দেশ কীভাবে সফল হয়েছে, কী ধরনের নীতি ও ব্যবস্থাপনা পর্যটক আকর্ষণে কার্যকর হয়েছে এবং পর্যটনসেবা কীভাবে আরও আধুনিক করা যায়—এসব বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।
দুই দেশ পর্যটন উন্নয়নে নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বেস্ট প্র্যাকটিস বিনিময়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর ফলে পর্যটন ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, আতিথেয়তা সেবা, পর্যটন বিপণন এবং পর্যটক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার পর্যটন উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটন সম্ভাবনা মালয়েশিয়ার জন্য পারস্পরিকভাবে কার্যকর হতে পারে।
সাংস্কৃতিক বিনিময়েও নতুন সম্ভাবনা
শুধু পর্যটক বাড়ানো নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়টিকেও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক বিনিময়, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, নদী, গ্রামীণ জীবন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে, তেমনি মালয়েশিয়ার বহুজাতিক সংস্কৃতি, দ্বীপ, সমুদ্রসৈকত, বনাঞ্চল ও আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়।
এ কারণে পর্যটনকে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা
আতিথেয়তা খাতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণদের পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে দেশের অভ্যন্তরে পর্যটন শিল্পের মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশেও দক্ষ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার পর্যটন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়লে দুই দেশের শ্রমবাজার ও পর্যটন খাতের মধ্যে একটি নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
বৈঠকে যারা ছিলেন
বৈঠকে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ট্যুরিজম মালয়েশিয়া এবং কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণ দুই দেশের পর্যটন সহযোগিতাকে শুধু নীতিগত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
অর্থনীতিতেও পড়বে ইতিবাচক প্রভাব
পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়লে এর প্রভাব শুধু পর্যটক যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিমান চলাচল, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্রাভেল এজেন্সি, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। দুই দেশের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে যৌথ পর্যটন প্যাকেজ, সাংস্কৃতিক সফর এবং বিশেষ পর্যটন কর্মসূচির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক বৈঠককে দুই দেশের পর্যটন সম্পর্কের পরবর্তী ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দুই দেশের পর্যটন সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে।
দুই পক্ষের প্রত্যাশা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও গভীর করবে এবং পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এমএম