শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রোকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কোনো দেশের আধিপত্য মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে জনগণের প্রত্যাশাও স্পষ্ট—দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকবে, পারস্পরিক সম্মান থাকবে এবং উভয় দেশের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “পাশের দেশ ভারত সফর করতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে সেই সফর হতে হবে সমতার, সমমর্যাদার ও বন্ধুত্বের।”

জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমমর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের আধিপত্য মেনে না নেওয়ার কথাও বলেন।

‘সরকারপ্রধান চাইলে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেন’

দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই সঙ্গে সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধান। ফলে তিনি চাইলে দেশে চলমান চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন।

তার ভাষ্য, এসব অনিয়ম বন্ধ করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার সেগুলো বন্ধ করতে কতটা আন্তরিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায়।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সরকারের নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার ওপরও বিষয়গুলো নির্ভর করে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

ভোটাধিকার রক্ষায় মাঠে থাকার নির্দেশ

আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদেরও প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান জামায়াতের আমির। তিনি নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করার নির্দেশ দেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনোভাবেই যেন কারও ভোট অন্য কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সোচ্চার থাকতে হবে। জনগণ যাতে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, নির্বাচনী পরিবেশ যাতে সুষ্ঠু থাকে—সেদিকে নজর দেওয়ার জন্য তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

তার বক্তব্যে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের অধিকার ও অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি দলীয় কর্মীদের জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার পাশে থাকার নির্দেশ দেন।

‘আদর্শিক সংগঠন হিসেবে আস্থা ধরে রাখতে হবে’

দলীয় সংগঠন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেশের মানুষের কাছে একটি আদর্শিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত এবং আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের মানুষের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাদের পাশে থাকার মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়।

সম্মেলনে তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

রাজশাহীতে জামায়াতের সদস্য সম্মেলন

রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. মাওলানা কেরামত আলী এমপির সভাপতিত্বে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি। আরও বক্তব্য দেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আব্দুল খালেক।

এ সময় রাজশাহী মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমির আবু মোহাম্মদ সেলিম, ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সহকারী সেক্রেটারি মাহবুবুল আহসান বুলবুল, অধ্যক্ষ মো. শাহাদৎ হোসাইনসহ মহানগরীর শূরা সদস্য এবং বিভিন্ন থানার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে রাজশাহী মহানগরীর সহস্রাধিক রোকন সদস্য—নারী ও পুরুষ—অংশ নেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

জেলা জামায়াতের সম্মেলনেও বক্তব্য

রাজশাহী মহানগরীর সম্মেলন শেষে বিকেলে একই স্থানে রাজশাহী জেলা জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রোকন) সম্মেলনেও প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান।

দুই সম্মেলনেই দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম, জনসম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে তার বক্তব্যে যেমন পারস্পরিক সমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ঘুষের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটাধিকার রক্ষাকে দলীয় কর্মীদের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

রাজশাহীর এই দুটি সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক, সরকারের প্রশাসনিক ও দুর্নীতিবিরোধী ভূমিকা এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। এর মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বার্তাই দিয়েছেন জামায়াতের আমির।

এমএম