বৃহস্পতিবার রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী শিক্ষা শিবিরে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেই বক্তব্যের রেকর্ডও রয়েছে। অথচ এখন একই গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। একই বিষয়ে একেক সময় একেক ধরনের অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে দ্বিচারিতা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের প্রশ্ন, যদি গণভোটকে অবৈধ বলা হয় এবং সংবিধানে এর অস্তিত্ব না থাকার কথা বলা হয়, তাহলে সেই গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সরকার কীভাবে বৈধ হয়? তার দাবি, জনগণের ভোটে যে প্রক্রিয়ায় সরকার গঠিত হয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলও সম্মানের সঙ্গে মেনে নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে গণভোটের রায় বাতিল করার নজির নেই। কোনো গণভোটের ফল অস্বীকার করা হলে তা শুধু একটি সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা নয়; এর মাধ্যমে জনগণের মতামত, ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়।

উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ

জামায়াতের এই নেতা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগও তোলেন। তার দাবি, জামায়াতসহ ১১ দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাকে প্রাপ্য উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, জামায়াতকে ভোট দেওয়া মানুষ যেন এ দেশের নাগরিক নন। শুধু ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরাই সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন—এমন একটি ধারণা তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, বিএনপির সংসদ সদস্যদের এলাকায় একের পর এক প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হলেও জামায়াতসহ ১১ দলের সংসদ সদস্যদের এলাকায় একই ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি তাদের সাধারণ বরাদ্দও কাটছাঁট করে অন্যত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিশেষ বরাদ্দের নামেও বড় অঙ্কের অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে বলে দাবি করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প, বরাদ্দের নথি বা পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি।

দলীয়করণ ও নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সর্বস্তরে দলীয় প্রভাব বিস্তার দেশের জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি দাবি করেন, অতীতেও বিএনপি সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল এবং বর্তমানে একই ধরনের প্রবণতা আবারও দেখা যাচ্ছে। জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেও দলীয় নেতাদের বসানোর অভিযোগ করেন তিনি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানান।

ফ্যামিলি কার্ড নিয়েও অভিযোগ

সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলছে বলেও দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তার মতে, বিভিন্ন অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার ঘটনায় তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেন তিনি। কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগও তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার নাম, ভুক্তভোগীর পরিচয় বা তদন্তের তথ্য তুলে ধরেননি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সংস্কারের দাবি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ও গোপনে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে জামায়াতসহ ১১ দলের মনোনীত প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন।

তিনি বলেন, সংবিধানের বর্তমান বিধানের কারণে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান না। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ভোটের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে তার দল।

সরকারের বিরুদ্ধে ‘দ্বিচারিতার’ অভিযোগ

গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল, সেসব সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার এখন পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার বক্তব্য, যে অধ্যাদেশের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যার মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণভোটের ফলকে এখন অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা হয় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতাকে তিনি ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণের রাজনৈতিক প্রতিফলন ভবিষ্যৎ নির্বাচনে দেখা যাবে এবং স্থানীয় নির্বাচনেই তার প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।

শিক্ষা শিবিরে জামায়াত নেতারা

রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী শিক্ষা শিবিরে গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও অঞ্চলের সহকারী পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর অঞ্চলের টিম সদস্য মাওলানা আব্দুল হাকিমসহ স্থানীয় নেতারা।

এ ছাড়া নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আনতাজুল ইসলাম এবং নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুল মুত্তাকিমসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে মূলত গণভোটের ফল বাস্তবায়ন, বিরোধী দলের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ, সরকারি নিয়োগে দলীয়করণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে সংস্কারের দাবি উঠে এসেছে। তার এসব অভিযোগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

এমএম