বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে নিহত শরীফ ওসমান হাদীর সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ভিত্তি নির্ধারণ। এসব বিষয়ে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রশ্নও সামনে আসবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন বিশেষ গুরুত্ব পায়। গত ৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ঘটনায় ভারতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা।
নাহিদ ইসলামের দাবি, নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলন ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ভারত সরকার একদিকে সংবাদ সম্মেলনের দায় অস্বীকার করছে, অন্যদিকে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনা কীভাবে এ ধরনের কর্মসূচিতে যুক্ত হলেন, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো স্বাধীনতাকামী সংগঠন যদি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এবং বাংলাদেশ সরকার যদি বলে যে এর দায় তারা নেয় না বা এ বিষয়ে তারা কিছু জানে না, তাহলে এমন ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—তা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে।
নাহিদ বলেন, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনকে শুধু শেখ হাসিনার বক্তব্য হিসেবে দেখলে চলবে না; এর মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের প্রতি কী বার্তা দিচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলোকে ভারতের অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, এ বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের কাছ থেকে এখনো যথাযথ বার্তা পাওয়া যায়নি। তিনি মনে করেন, ঘটনার জন্য ভারতের দুঃখ প্রকাশ করা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়াও আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে ভারতীয় প্রতিনিধিদের ডেকে বিষয়টি নিয়ে জবাবদিহি চাওয়া দরকার ছিল।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশের একটি আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে অন্য একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কী ধরনের বার্তা দেয়, সেটি বিবেচনা করা জরুরি।
তিনি ওই ঘটনাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘ছায়াযুদ্ধ’ ঘোষণার মতো বলেও মন্তব্য করেন। তবে এটি তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও বক্তব্য—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে তা উপস্থাপন করা হয়নি।
ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কয়েকটি নির্দিষ্ট ইস্যুর সমাধান চান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা কূটনৈতিক সৌজন্য যথেষ্ট নয়; বাস্তব সমস্যাগুলোরও সমাধান করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো, নিহত শরীফ ওসমান হাদী-সংক্রান্ত ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো, অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানের কথা বলেন।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তিনি পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পুনর্গঠনের পক্ষে। তার মতে, এসব বিষয়ে অগ্রগতি না হলে দুই দেশের সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টিও এই বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া বক্তব্য এবং তার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন ইতোমধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠেছে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের সারকথা হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট সমাধান ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আগের জায়গায় নেওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তির আগে তারেক রহমানের ভারত সফরও হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারত সরকারের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থান ও মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচ্য। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা,
এমএম