একটি ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে এক পতাকাতলে ও এক আদর্শে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে গঠিত উসমানীয় খিলাফত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসলাম পৌঁছে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাশাপাশি সার্বিকভাবে আরব ও মুসলিম বিশ্বের জন্য তারা অসামান্য অবদান রেখে গেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্য ও পুরো মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা করেছিল। তারা শত্রুদের সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে এবং পবিত্র হিজাজ ভূমিতে ঔপনিবেশিকদের অনুপ্রবেশ ও তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। পবিত্র কাবা শরীফ ও মসজিদে নববীসহ ইসলামিক পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় তারা ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরবর্তীতে তারা জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়ে আল-আকসা মসজিদ নিয়ন্ত্রণে নেয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, উসমানীয় খিলাফত সারা বিশ্বে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে এক মহান ভূমিকা পালন করেছিল। তারা মুসলমানদের প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও পরিচালনা করেছিল, যা ইউরোপজুড়ে ইসলাম সম্প্রসারণের পথ সুগম করে। ইউরোপে আজ অবধি টিকে থাকা অজস্র মসজিদ ও ঐতিহাসিক ইসলামিক নিদর্শন সেই সোনালী ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। উসমানীয়দের আরেকটি বড় ও উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা ছিল ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, এর ফলে ইসলামের বার্তা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল।

তবে সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের মৃত্যুর মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী যুগের সমাপ্তি ঘটে। তার মৃত্যুর পর দুর্বল সুলতানদের হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার চলে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। পাশাপাশি খিলাফতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন ভুলত্রুটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

উসমানীয় খলিফারা নিজেদের নামের পাশে সবসময় ধর্মীয় উপাধি ব্যবহার করতেন, যেমন হারামাইনের খাদেম বা রক্ষক এবং খলিফা। তারা কঠোরভাবে ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাদের শাসননীতির মূল উৎস ছিল পবিত্র কোরআন এবং সুন্নাহ। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন এবং বিজয় অভিযানেও উসমানীয়দের এই ধর্মীয় আদর্শ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত।

উসমানীয়দের বিজয় অভিযান

উসমানীয়দের প্রথম দিকের বিজয় অভিযানগুলো উত্তর দিকে পরিচালিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণসাগর ও মারমারা সাগর সংলগ্ন এলাকাগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা। সেই সময় থেকে প্রথম উসমান পার্শ্ববর্তী খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে ইসলামের নামে দুর্গগুলো জয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন। এরপর বংশের তৃতীয় শাসক তৃতীয় মুরাদ বলকান অঞ্চলে খ্রিস্টান শক্তিগুলোকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। তিনি রাজ্যের রাজধানী বুরসা থেকে এদিরনেতে স্থানান্তরিত করেন, যা পরবর্তীতে অজস্র মসজিদ ও মাদ্রাসায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এভাবে উসমানীয় বাহিনী পূর্ব ইউরোপের অনেক শহর জয় করে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া। মূলত ইসলামের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ইউরোপ অভিমুখে এই বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছিল।

এরপর আসে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই বিজয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই বাণীকে সত্য প্রমাণিত করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, তোমরা অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। কতই না উত্তম সেই সেনাপতি এবং কতই না উত্তম সেই সেনাবাহিনী!

এই বিজয়ের পর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ বা মুহাম্মদ আল-ফাতিহ সেখানে আজান দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল আয়া সোফিদয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেন এবং শহরের নাম বদলে রাখেন ইসলামবুল, যার অর্থ ইসলামের রাজধানী।

বিশ্বজুড়ে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের এই ভূমিকা সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তারা মহানবীর সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেছিল যেখানে বলা হয়েছে, আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও তা পৌঁছে দাও। উসমানীয় সুলতানরা সত্যের প্রকাশ এবং অজ্ঞতা দূরীকরণের এই নির্দেশ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এ কারণেই উসমানীয় খিলাফত ক্রুসেডার ও ইহুদিদের চক্ষুশূলে পরিণত হয় এবং তারা এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও একের পর এক আঘাত হানতে শুরু করে।

ঐতিহাসিকরা একমত যে, সুলতান সুলেমানের মৃত্যুর পর উসমানীয়দের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। এরপর একের পর এক দুর্বল সুলতানরা সিংহাসনে বসেন এবং সাম্রাজ্যের ভেতরে নানা অনিয়ম দানা বাঁধতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত এই সুবিশাল খিলাফতের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজ্যে অন্যায়-অবিচার চেপে বসে এবং আলেমরা অত্যাচারী শাসকদের হাতের পুতুলে পরিণত হওয়ায় উসমানীয়দের সেই প্রতাপ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

তবে পরিশেষে এটা স্পষ্ট যে, উসমানীয়রা শুধু তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছিল বলে যে দাবি করা হয়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের দ্বারা উসমানীয় ইতিহাস বিকৃতি ও সন্দেহের শিকার হয়েছে। প্রকৃত সত্য হলো, উসমানীয় খিলাফতের প্রধান লক্ষ্যই ছিল মানবজাতির কাছে সত্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা। উসমানীয়রা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিল। এর ইতিবাচক ফল তারা ইহকাল ও পরকালে লাভ করেছিল; সমাজ লাভ করেছিল নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং নৈতিকতা।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, উসমানীয় খিলাফত পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য চিরন্তন গর্বের প্রতীক ছিল এবং থাকবে। এমনকি আধুনিক যুগে এসেও তুরস্কের বর্তমান সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার অচলায়তন ভেঙে পুনরায় এই ইতিহাস ও ধর্মের প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো ও ইসলামী পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় কাজ করার কারণে বর্তমান তুর্কি শাসনব্যবস্থাকে অনেকেই এখন নতুন উসমানীয় বা নব্য-উসমানীয় বলে অভিহিত করছেন।

এমএম