এরই মধ্যে নতুন করে সংকট বাড়িয়েছে মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। টার্মিনালে মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় বুধবার দুপুরের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমদানি করা এলএনজির জন্য আপাতত সামিটের টার্মিনালের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২৮ এবং এলএনজি থেকে ৬৬১ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার দিকে এলএনজি সরবরাহ কমে ৫৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ১ হাজার ৬২৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস প্রবাহ কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৮৯ মিলিয়ন ঘনফুটে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এক কর্মকর্তা জানান, বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে এক্সিলারেটের টার্মিনালে থাকা এলএনজির শেষ মজুতও শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই ওই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
কার্গো না থাকায় টার্মিনাল বন্ধ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ এলএনজি কার্গোর ঘাটতি। এর আগে টার্মিনালের বয়লার মেরামত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এক্সিলারেট জানিয়েছিল, বয়লার সচল করতে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগবে। পরে বয়লার সচল হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি মজুত না থাকায় টার্মিনালটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কম দামে এলএনজি কেনার জন্য কয়েকটি কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। চলতি মাসে এসবের চারটি কার্গো আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত একটিও পৌঁছায়নি। ফলে টার্মিনাল প্রস্তুত থাকার পরও এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, আজ বৃহস্পতিবার একটি কার্গো আসতে পারে, যা সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হবে। আর এক্সিলারেটের জন্য কার্গো রোববার বা সোমবার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত আগামী কয়েক দিন এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি হাজার মিলিয়ন ঘনফুট
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর ক্রমেই নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। বাকি ৭০ শতাংশ আসে দেশীয় উৎস থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে শুধু এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দায়ী নয়। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপ থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন যুক্ত না হওয়াই সংকটের বড় কারণ। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। তার হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে আমদানিনির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্যাসের ব্যয়ও বাড়ছে।
শিল্পে উৎপাদন বন্ধ, বাড়ছে লোকসানের শঙ্কা
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিল্পখাত। গ্যাসের চাপ না থাকায় টেক্সটাইল, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ। শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলমান জ্বালানি সংকট দ্রুত পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নাও হতে পারে। সংকট কাটাতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দরপত্র ছাড়াই ১৪ কার্গো এলএনজি
সংকট মোকাবিলায় উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই আরও ১৪ কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন ও জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুই কার্গো করে এসব এলএনজি কেনা হবে।
বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে এসব এলএনজি আমদানি করা হবে। সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণ করে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছে সরকার।
জ্বালানি নিরাপত্তায় কাতারের সহযোগিতার আশ্বাস
এদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে কাতার। বুধবার দোহায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি এ আশ্বাস দেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে বর্তমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি সহযোগিতা, বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহ আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি করে বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে হবে।
বর্তমানে একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনায় কারিগরি সমস্যা ও কার্গো সংকট যুক্ত হওয়ায় বারবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে ধস নামছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়।
ফলে গ্যাসের এই সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়- এটি দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে অর্থনীতির চাকা আরও ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনএইচ