নিউ ইয়র্ক: বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রাধিক ধারা অব্যাহত না থাকায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও ভুলণ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রতিনিয়ত হত্য ও গুমের মত ঘটনা ঘটছে, চলছে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আর এসব হত্যাকান্ডের পাশাপাশি ব্যহত হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। নির্যাতিত হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মী তথা সাংবাদিকরা।
‘ফ্রিডম অব প্রেস: পার্সপেক্টিভ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে অংশ নেয়া বক্তাদের মুখে এসব কথা উঠে আসে। প্রথমবারের মত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘জাস্ট নিউজ বিডি’ আয়োজিত এই সেমিনারে অংশ নেন দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডির্পাটমেন্টের ফরেন প্রেস, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনের নেতা এবং প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
জাস্ট নিউজবিডি’র সম্পাদক ও ইউএনসিএ’র সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারীর সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড নেশন্স করসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়শন ‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি, যুক্তরাষ্ট্রর স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের পরিচালক প্রিন্স ড্যাল।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের এই পরিচালক ওবামা প্রশাসনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। আয়োজিত সেমিনারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আসলে কিছু বলার নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশ ইস্যুতেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট সচেতন। প্রতিবছর একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়টি গুরুত্ব পায়।’
‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাঙ্খিত হলেও তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবীর দেশে দেশে এই স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে।’ এসময়ে জাতিসংঘে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গণমাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সমিচিন নয়।’
ফরেন সাংবাদিকদের মধ্যে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের সাবেক সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান মিস ডুলসি লিমব্যাক বলেন, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে, তা সত্যি প্রসংশাযোগ্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘সাংবাদিকতা সাধারণত একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা; বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ ব্যাপক যা আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছি।’
সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে ডুলসি বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাবিহীন সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আমি আশা করছি বাংলাদেশ এই অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।’
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ইমরান আনসারীর মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র সাংবাদিক মিস ডুলসি লিমব্যাক, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও নিউইয়র্ক ভিক্তিক টাইম টেলিভিশনের সিইও আবু তাহের, আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, দৈনিক মানব জমিন পত্রিকার ডেপুটি এডিটর মনির হায়দার, উইকলি হলিডের সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের।
মূল প্রবন্ধে সাংবাদিক ইমরান আনসারী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ভূলণ্ঠিত করতে বিগত সরকারগুলোর আইনী হস্তক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। সম্প্রতি সংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিধান সংযোজন, আইসিটি এ্যাক্ট ও সম্প্রচার নীতিমালার নেতিবাচক দিকগুলো মূল প্রবন্ধে তুলে ধরেণ।
প্রবন্ধের শেষাংশে ৬ দফা সুপারিশ করেন তিনি। যাতে তিনি চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি ও দৈনিক আমার দেশসহ বন্ধ মিডিয়া খুলে দেয়ার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ইনকিলাবের বার্তা সম্পাদক রবিউল্লাহ রবির নি:শর্ত মুক্তির দাবী জানান।
টাইম টিভির সিইও আবু তাহের বলেন, ‘এটা সত্যি যে বাংলাদেশে অনেক মিডিয়া এখন সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করছে। কিন্তু দেখতে হবে এসব মিডিয়ার নীতি-নির্ধারক কারা? অতীতেও এমনটি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এসেই বিরোধী মতের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক পত্রিকা বন্ধ, সম্পাদককে আটক করে নির্যাতন, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ সবগুলোই হচ্ছে বিরোধী মতের মালিকানার গণমাধ্যম। এসব অব্যাহত থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।’
প্যানেলিস্ট আলোচক হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। যা আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে ছিল না। এটা সত্যিই দুঃখজনক।’ দেশের এই দূরাবস্থার জন্য নিজেদের বিভাজনকেই দায়ী করেন তিনি।
বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের বিচার বিভাগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।’
সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের বলেন, ‘সরকারের দমন-নীতি অতিতের সকল মাত্র ছাড়িয়ে গেছে। মিডিয়া সরকারের আক্রমনের স্বীকার। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে কারান্তরিন হতে হয়। যা আইন করে পাশ করা হয়েছে।’
সাংবাদিক মনির হায়দার বলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে তুলনা হতে পারে না।’ কারন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ছিলনা বলেই আমাদের পূর্বসূরিরা যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীন দেশে এই সঙ্কটের আবর্তে আমরা কেনো থাকবো? প্রশ্ন রাখেন মনির হায়দার।
অন্যান্যের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন, সাপ্তাহিক প্রবাসের প্রধান সম্পাদক ওলিউল আলম, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক জয়নাল আবেদিন প্রমুখ।
সেমিনারে আলোচনায় উঠে আসে সাম্প্রতিক সময়ে আইসিটি অ্যাক্ট নামের বিশেষ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক মতাদর্শ’সহ নিবর্তনমূলক নানা বিষয়।
পাশাপাশি সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির হত্যা’সহ নির্যাতিত-নীপিড়িত সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়। এতে, বন্ধ হওয়া সকল গণমাধ্যম খুলে দেয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত ও আটক সকল সাংবাদিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়।
সাপ্তাহিক প্রবাসের প্রধান সম্পাদক ও বার্তা সংস্থা বাসস’র প্রাক্তন সিনিয়র সাংবাদিক ওয়ালিউল আলম বলেন, ‘আমরা যখন দেশে সাংবাদিকতা করেছি; তখনও দেখেছি জার্নালিজম এথিকস কিছুটা মানা হতো। এখানে এসেও সেটা খেয়াল করছি। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে এখানকার মিডিয়াগুলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দলীয় মতাদর্শের লোকদের যে ভাবে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দিয়েছে, তাতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জার্নালিজম এথিকস সব কিছুই ভুলণ্ঠিত করেছে।’
সাংবাদিক জয়নাল আবেদিন তুলে ধরেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ বিষয়ে বিশ্ব মিডিয়াকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
প্রবাসী সাংবাদিক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের মিডিয়া, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে দলীয় করণের ফলে আজকে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই।’ এ জন্য তিনি বর্তমান সরকারের মিডিয়া নিয়ন্ত্রনের নগ্ন হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন।
সেমিনারে অন্যান্য সব প্যানেলিস্টরাই, বাংলাদেশে সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত হত্যা গুম ও খুনের মত ঘটনায় উদ্বেগও জানান আলোচকরা।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন, দৈনিক নায়দিগন্তের বিশেষ প্রতিনিধি শওকত ওসমান রচি, সাপ্তাহিক বাংলা টাইমসের সম্পাদক তাসের মাহমুদ, সময় টিভির যুক্তরাষ্ট্র ব্যুরো চীফ শিহাব উদ্দিন কিসলু, , নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাপ্তাহিক রানার সম্পাদক কাওসার মমিন, টাইম টেলিভিশনের বার্তা প্রধান আবিদুর রহিম, নিউজ কনসালটেন্ট পুলক মাহমুদ, দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম, এটিএন বাংলার রিজু আহমেদ, ডিজাইন মিডিয়ার সাজ্জাদ, সাপ্তাহিক পরিচয়ের সালাহ উদ্দিন রাসেল এবং টাইমস২৪ বিডির মোহাম্মদ সোহেল’সহ প্রবাসী সাংবাদিকরা।
সেমিনার শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা আয়োজিত ইফতারে অংশ নেন।
কেবি





