মির্জা তারেক : জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আমার চাকরি জীবনের শুরু ১৯৮৩ সালে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অফিসের প্রধান ছিলাম।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে ২০০২ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিই এবং বিজেম প্রতিষ্ঠা করি।

ছাত্র জীবন থেকেই কি আপনি চাকরি করছেন?
মির্জা তারেক : হ্যাঁ। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই আমার চাকরি শুরু। তখন আমি ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে যুক্ত হই।

এরপর ১৯৮৩ সালে মাস্টার্স শেষ করে ওই পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার পদে যোগদান করি। কয়েক মাসের মধ্যেই তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের নির্দেশে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। কিছুদিন বেকার থাকার পর শুরু হয় জনসংযোগ পেশায় নতুন কর্মজীবন।

সাংবাদিকতা থেকে জনসংযোগ/পাবলিক রিলেশন্সে যাত্রা; দুটোর সঙ্গে মিল কোথায়-
মির্জা তারেক : সাংবাদিকতা এবং জনসংযোগ পেশার মধ্যে ব্যাপক মিল। সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জনসংযোগ। জনসংযোগকে পরোক্ষ সাংবাদিকতাও বলতে পারি। দুটি পেশাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একটি অপরটির পরিপূরক। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় তথ্যের ৭০ ভাগই যোগান দেয় জনসংযোগ বিভাগ।

সব প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ কর্মকর্তা রয়েছে কিনা বা থাকা উচিত কিনা?
মির্জা তারেক : সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনেরও এ পদটি থাকা উচিত। পাশ্চাত্যের বহু দেশেই সেলিব্রেটিদেরও জনসংযোগ কর্মকর্তা রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি গির্জাতেও এ পদ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও কোনো জনসংযোগ কর্মকর্তা নেই। এটি খুবই দুঃখজনক।

আপনার কি মনে হয়; আমাদের দেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কি সঠিক জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে-

মির্জা তারেক : বর্তমানে দেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় সঠিকভাবে জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনসংযোগের প্রাধান্যই বেশি। কোনো বিশেষ বা একক ব্যক্তির জন্য নয়; জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ঘিরে। দেশের বেশিরভাগ অফিসেই পূর্ণাঙ্গ জনসংযোগ অফিস, এ সংক্রান্ত নীতিমালা ও কৌশল অনুপস্থিত।

আপনি পাবলিক রিলেশন্সের ওপর বইও লিখেছেন; একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের পিআর সংস্থার সদস্যও; তো ক্যারিয়ার হিসেবে পাবলিক রিলেশন্সের ভবিষ্যৎ কেমন?

মির্জা তারেক : আমার ‘জনসংযোগ ও প্রকাশনা’ এবং ‘রাজনীতিতে জনসংযোগ : বক্তৃতার রীতিনীতি ও প্রচার কৌশল’ গ্রন্থ দুটি এ বিষয়ে লেখা বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ। প্রথম গ্রন্থটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

এ বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রচুর লেখালেখিও করেছি। রিসোর্স পার্সন হিসেবে লেকচার দিয়েছি বহু প্রতিষ্ঠানে। আমি জনসংযোগ পেশাজীবীদের সর্ববৃহৎ সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক রিলেশন্স অ্যাসোসিয়েশন (IPRA)’ সহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য এবং বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতির সঙ্গে জড়িত ১৯৮৩ সাল থেকে। বস্তুতপক্ষে এটি একটি বিশেষায়িত পেশা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ পেশার গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, পেশাজীবীদের সংখ্যা তেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জনসংযোগ কর্মকর্তা-পাবলিক রিলেশন্স অফিসার নিয়োগে দেখা যায়, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী বা সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞদের প্রাধান্য দেয়া হয়; কেন?

মির্জা তারেক : জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেয়ার কারণ হল তাদের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। অপরদিকে প্রফেশনাল সাংবাদিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কেননা জনসংযোগ এবং সাংবাদিকতা প্রায় একই।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাংলা, ইংরেজি এবং বিবিএর কিছু বিষয়ের নামও এখন উল্লেখ থাকে; তার মানে- অন্য সাবজেক্টের শিক্ষার্থীরা কি জনসংযোগ কর্মকর্তা হতে পারবেন না?

মির্জা তারেক : সাংবাদিকতা বা মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়নকারীদের প্রাধান্য দেয়া হলেও আজকাল এ পেশায় নিয়োগে অন্য বিষয়ে পড়ুয়াদেরও নিয়োগ দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলী থাকলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এ পেশায় আসতে ও সাফল্য পেতে পারেন।

পাবলিক রিলেশন্সে যারা কাজ করেন, তাদের মূল কাজ কী কী?

মির্জা তারেক : জনসংযোগ পেশাজীবীদের মূল কাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ও বিজ্ঞাপন উপযুক্ত গণমাধ্যমে প্রচার, বিজ্ঞাপন সম্পর্কে ভালো ধারণা, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা, গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে সমুন্নত রাখা, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ, সংকট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ধারণা এবং তথ্য সংরক্ষণ প্রভৃতি। প্রতিষ্ঠানের মানসম্পন্ন প্রকাশনা বের করাও এ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আপনি কেন সাংবাদিক না হয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা হলেন?

মির্জা তারেক : সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনার সুবাদে আমি জনসংযোগ সম্পর্কে জানতে পারি। পরে সাংবাদিকতাকালে জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উঠা-বসায় পেশাটিতে ভালোলাগা তৈরি হয়। ১৯৮৩ সালে দৈনিক দেশ বন্ধ হয়ে গেলে, সাংবাদিকতা ছেড়ে জনসংযোগ পেশায় চলে আসি।

দক্ষ জনসংযোগ কর্মকর্তার কি কি গুণাবলী থাকা দরকার-

মির্জা তারেক : জনসংযোগ কর্মকর্তার প্রথমেই মনে রাখা উচিত পেশাটি যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি সৃজনশীল ও শৈল্পিক। মানবিক ও প্রাযুক্তিক যোগাযোগে পারদর্শিতা, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিষয়ে জ্ঞান, আধুনিক মুদ্রণ ও তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষতা, ইন্টারনেটসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে জানা, ভালো প্রেস বিজ্ঞপ্তি লিখতে ও বলতে পারা, গণমাধ্যমের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা ও বজায় রাখা, প্রতিষ্ঠানের সবার সঙ্গে যোগাযোগ, পরিশ্রম করার মানসিকতা, জনসংযোগ সংশ্লিষ্ট আচরণবিধি ও নীতিমালা মেনে চলা, আন্তরিকতা এবং স্মার্টনেস একজন জনসংযোগ কর্মকর্তার প্রধান গুণাবলী। এছাড়াও ফটোগ্রাফি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।

ভবিষ্যতে যারা পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার হতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মির্জা তারেক : প্রথমত পেশা ও নিজের কাজ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা। এছাড়াও নিষ্ঠা, শ্রদ্ধাবোধ, টিম ওয়ার্ক, দায়িত্ব ও সময় সচেতন হওয়াটা জরুরী। একই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোতে নজর দিতে হবে।
আপনার প্রতিষ্ঠান বিজেম সাংবাদিকতা ও উপস্থাপনাসহ কয়েকটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে; এখানে কি জনসংযোগ নিয়ে প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ আছে?

মির্জা তারেক : সংবাদ উপস্থাপনা ও সাংবাদিকতার বিভিন্ন কোর্স, ভিডিও ক্যামেরা পরিচালনা ও এডিটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, ওয়েব ডিজাইনিং, ফটোগ্রাফি অ্যান্ড ফটো সাংবাদিকতা মূল কোর্স হলেও বিজেম দেশের একমাত্র বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, যেখানে ২০০৩ সাল থেকেই ‘জনসংযোগ’এর ওপর প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে। আমরা এ পর্যন্ত ৯ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বহু জনসংযোগ কর্মকর্তাদের ‘জনসংযোগ, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

জনসংযোগ কর্মকর্তার পক্ষে নিজের প্রতিষ্ঠানের ব্রান্ডিং একটা চ্যালেঞ্চিং বিষয়; সেখানে সফলতার মাপকাঠি কী?

মির্জা তারেক : ব্রান্ডিং মূলত মার্কেটিংয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হলেও আধুনিক জনসংযোগের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এটি। এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলে, মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতাকে শীর্ষে নিয়ে যেতে জনসংযোগ কর্মীরা সবসময়ই সচেষ্ট থাকেন।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ যৌথভাবে এ কাজটি করে থাকে। এখানে সফলতা মাপার সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকলেও, ব্রান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার মান সম্পর্কে মানুষের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জনই বিবেচ্য বিষয়।

যিনি মির্জা তারেক নামেই পরিচিত। তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা, জনসংযোগ, গবেষণা ও প্রকাশনায় যুক্ত থেকে অর্জন করেছেন ব্যাপক খ্যাতি।

ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অনার্স প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অধুনাবিলুপ্ত দৈনিক দেশে কয়েক বছর সাংবাদিকতার পর যোগ দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে।

১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প’ এবং ২০০২ সালে জনসংযোগবিষয়ক বৃহদাকার বই ‘জনসংযোগ ও প্রকাশনা’ প্রকাশিত হয়। ভারতের আনন্দ বাজার পাবলিশার্সসহ দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকায় তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

খ্যাতিমান এ জনসংযোগবিদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রিসোর্স পারসন এবং এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক। বর্তমানে বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতি এবং বাংলাদেশ সম্পাদনা ও প্রকাশনা সমিতির সভাপতি।

সাংবাদিকতা, জনসংযোগ ও গবেষণায় অবদানের জন্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদাপূর্ণ ‘তিস্তা-তোরষা সম্মাননা’, জাতীয় প্রেস ক্লাব লেখক পদক, স্বাধীনতা সংসদ এডুকেশন অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার। ২০০২ সালে বুয়েটের চাকরি ছেড়ে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান বিজেম।

এসএম