বাংলাদেশে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত গণমাধ্যম সিএনএনের মুক্ত কলাম সাইট 'আই সিএনএন'-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। “Is police department in Bangladesh a substitute for the court of law?”- এই শীরোনামে গত ২২ শে জানুয়ারি প্রকাশিত ওই মন্তব্য প্রতিবেদনের খানিকটা টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হলো:
"গত সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত তথাকথিত পুলিশী বন্দুক যুদ্ধের নামে বিএনপির ২জন ও জামায়াতের ১জনসহ অন্তত তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এটা এ কারণেই 'তথাকথিত'-যেহেতু সব ঘটনাতেই একটি পক্ষ অর্থাৎ পুলিশের অবস্থান হলো সশস্ত্র এবং হতাহতদের অবস্থান নিরস্ত্র। অথচ এরপরও এটাকে 'বন্দুক যুদ্ধ' বা 'গোলাগুলি'-এমনসব অভিধানে অভিহিত করা হয়। অদ্ভুত!
গত পরশু গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকা ৫ ছাত্রকে পুলিশ তাদের বাসা থেকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় গ্রেফতার করে। এরপর একদিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করেনি। অথচ আদালতে হাজির না করে পুলিশ কাস্টডিতে ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখার কোন বিধান নেই।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছে- মোস্তাফিজুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, আরিফুর রহমান আরিফ, খালিদ সাইফুল্লাহ এবং আতিয়ার রহমান।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু শিবির কর্মীকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং পরে আর তাদের কোন হদিস মেলেনি। অবশ্য তাদের মধ্যে পরে কয়েকজনের মৃহদেহের সন্ধান মেলে এবং বাকি অনেকেই এখনো নিঁখোজ রয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল ৩৩ (২) অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে আটক করলে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতমো ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তাকে হাজির করতে হবে।
এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে সচরাচর যেটা বলে থাকে তা হলো 'এত জন শিবির সদস্য আটক' অথবা 'আটককৃতদের মধ্যে এতজন শিবির সদস্য রয়েছেন'।
অথচ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামী ছাত্র সংগঠন। শিবির কোন নিষিদ্ধ দল নয় এবং বাংলাদেশের কোন আইনে মাধ্যমে শিবিরকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। সুতরাং দেশের আইনে এটা একটি শতভাগ বৈধ ছাত্র সংগঠন।
আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে যে, পুলিশ সদস্যরা বাধ্যতামূলক সময়সীমার মধ্যে আটককৃতদের আদালতে হাজির করতে পারেনা। অথচ এটা কোন সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধানই একজন আটককৃতকে এই অধিকার দিয়েছে এবং আইন প্রয়োগকারীদের ওপর এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করেছে।
এই বাস্তবতার আলোকে এখন এমনই মনে হচ্ছে যে, পুলিশ সদস্যরা প্রচলিত বিচার বহির্ভূত কোন ভিন্ন বিচারব্যবস্থা কায়েম করতে আগ্রহী এবং ক্রমাগত সেদিকেই আগাচ্ছে। আর এ কারণেই প্রতিনিয়ত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক কারণে পুলিশের গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটছে।
আমরা জানিনা ক্রসফায়ারের নামে আবারও কোন রাজনৈতিক অপরাধ করার ইচ্ছে পুলিশ মনে মনে পোষণ করছে কীনা, কারণ আটককৃতদের আদালতে হাজির না করার মধ্য দিয়েই পার হতে যাচ্ছে আরও একটি দিন।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে চাই-পুলিশ কি বিচারিক আদালতের বিকল্প কোন বৈধ বিকল্প প্রতিষ্ঠান? যদি তা না হয়, তাহলে কেন পুলিশের এমন অপরাধের পরও বিচার অঙ্গন চুপ করে আছে? এটা কি এ কারণেই যে আটককৃতরা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত? এ বিষয়ে গণমাধ্যম কেন নীরব? গণমাধ্যম কি দ্বিমুখী নীতিতে চলছে? জামায়াত-শিবিরে জড়িতরা কী দেশের নাগরিক নয়? তারা কি দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক? ইসলামী ছাত্রশিবির কি বাংলাদেশের কোন নিষিদ্ধ সংগঠন? দেশের প্রচলিত কোন আইনে কি শিবিরের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা শিবিরে যোগ দেয়া নিষিদ্ধ? কোথায় সেসব তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠন? ড. মিজান ও মিস সুলতানা কামালের মতো মানবাধিকারের রক্ষকরা কোথায়?
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে এমন অঙ্গিকার ছিল যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তারা 'জিরো টলারেন্স' নীতি অবলম্বন করবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সরকার তার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করে গুম, রিমান্ডের নামে নির্যাতন এবং বিরোধী নেতাকর্মী নির্মূলের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
সরকার গণমাধ্যমের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। ইসলামিক টিভি, দিগন্ত টিভি এবং দৈনিক আমার দেশের কার্যক্রম এরইমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ভাইবার, ট্যাঙ্গো এবং ওয়াটস আপ ব্লক করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণেই বেশিরভাগ মানুষ বর্তমান বাংলাদেশকে 'পুলিশি রাষ্ট্র' হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
আই সিএনএনে প্রকাশিত মূল মন্তব্য প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন: http://ireport.cnn.com/docs/DOC-1208421
কেবি





