দেশের গণমাধ্যমজুড়ে ভয়াবহব দুর্দিন চলছে উল্লেখ করে সাংবাদিক নেতারা বলেছেন, এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চয়তার পেশা হচ্ছে সাংবাদিকতা। এক সঙ্গে এত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও কয়েক হাজার সাংবাদিক বেকার থাকার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর ঘটেনি। দিন দিন বেকার সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে। নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও আর্থিক সংকটে পড়ে ওয়েজবোর্ডভূক্ত সংবাদকর্মীদের নির্ধারিত বেতনে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিদিনই কোন না কোন গণমাধ্যমে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। দলন, দমন আর নিপীড়নে বহু গণমাধ্যমে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে গোটা গণমাধ্যমে গভীর অমানিষা নেমে আসবে। এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাংবাদিক সমাজকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পেশার নিরাপত্তার জন্য সর্বাত্মত সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই।

মহান মে দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার (১ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে অবস্থিত ইউনিয়ন কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় সাংবাদিক নেতারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদারের সভাপতিত্বে এবং ডিইউজে’র যুগ্ম সম্পাদক শাহীন হাসনাতের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী।

বক্তব্য রাখেন বিএফইউজের মহাসচিব এম. আবদুল্লাহ, সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, ডিইউজে’র সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মোরসালিন নোমানী, বিএফইউজে’র সহকারি মহাসচিব মোদাব্বের হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক জাকির হোসেন, সাবেক সহসভাপতি নূরুল আমিন রোকন, নির্বাহী সদস্য আসাদুজ্জমান আসাদ, সাংবাদিক নেতা এম এ নোমান, আফজাল বারী, শাখাওয়াত ইবনে মইন চৌধুরী, মো. বোরহান উদ্দিন, শেখ মিজান মাসুম, জেসমিন জুঁই, খন্দকার মাসুদুজ্জমান মাসুদ প্রমুখ। এছাড়া ডিইউজের সহসভাপতি সৈয়দ আলী আসফার, সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল আউয়াল ঠাকুর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রুহুল আমিন গাজী বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থা এখন শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকদের চেয়েও শোচনীয়। মে দিবসের চেতনা আজ হুমকির মুখে। শতকরা ৮ভাগ সরকারি কর্মচারির বেতন একশ’ ভাগের বেশী বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বাকী ৯২ ভাগ শ্রমজীবির আয় বাড়ানো হচ্ছে না। সংবাদকর্মীরা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বঞ্চিত ও নির্যাতিত। সাগর-রুণী হত্যার বিচার হচ্ছে না। একের পর এক সাংবাদিক খুন হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে অহরহ। দৈনিক ইনকিলাবে যে ঘটনা ঘটেছে তা উদ্বেগজন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তারা গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুন:প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিএফইউজে মহাসচিব এম আবদুল্লাহ বলেন, এবার এমন এক সময়ে আমাদেরকে মে দিবস পালন করতে হচ্ছে যখন সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতির হিঁড়িক পড়েছে। বাংলাদেশে এখন সাংবাদিকরাই সবচেয়ে বেশী শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। তিনি বলেন, দৈনিক ইনকিলাবের মত শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সিনিয়র সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করে যেনতেনভাবে বিদায় করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এ অন্যায় পদক্ষেপ সাংবাদিক সমাজ মেনে নেবে না। অবিলম্বে চাকরিচ্যুতি সাংবাদিকদের পুনর্বহাল ও ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত না করলে সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় ইনকিলাব কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।

কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নে মহানবী (স.) যে বাণী দিয়ে গেছেন তা সর্বকালের সর্বযুগের সেরা। তিনি ঘাম শুকানোর আগে শ্রমিকের মজুরী পরিশোধের তাগিদ দিয়েছেন। মেহনতি মানুষের অধিকারের প্রশ্নে জাতীয় কবি নজরুলের সাহসী উচ্চরণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা যায়।
দৈনিক ইনকিলাবে চাকরিচ্যুতির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আবদুল হাই শিকদার বলেন, ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ যে অন্যায় পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা থেকে সরে আসতে হবে। তা না হলে সাংবাদিক ইউনিয়ন কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।

এম এ আজিজ বলেন, ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে শ্রমিক হত্যার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী যে মে দিবসের সূত্রপাত তার চেতনা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় বাংলাদেশে উচ্চবিত্তদের দ্বারা শ্রমিক সমাজ শোষিত হচ্ছে। তিনি ইনকিলাবের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ সেখানে কর্মরত সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান।

জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ যা করছে তা চরম অন্যায়। সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুুতি ও নামমাত্র অর্থ দিয়ে বিদায় করার চক্রান্ত সাংবাদিক সমাজ প্রতিহত করবে। প্রয়োজনে ইনকিলাব অফিস ঘেরাওর কর্মসূচী দেয়া হবে। ইসলামের কথা বলবেন আর কর্মীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করবেন তা হবে না। তিনি বলেন, গমাধ্যমের মালিকরা দিনে দিনে ফুলেফেঁপে পুষ্ট হলেও কর্মীরা বঞ্চিত। বহু প্রতিষ্ঠানের মালিক সংবাদকর্মীদের শোষণ করে বিত্তবৈভব গড়ছেন। মাসের পর মাস বেতন দেন না।

সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, দু’একটি ছাড়া প্রতিটি সংবাদপত্রে এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। বহু মাসের বেতন বকেয়া । অন্যদিকে সাংবাদিকরা আজ সত্য উচ্চারণ করলেই মামলা-হামলা-গুম-খুনের শিকার হচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না।

জারিফ