একটি মাফিয়া গ্রুপ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক ফরহাদ মজহার।
আজ (শুক্রবার) রাজধানীর ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনে দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচারের ওপর আরোপিত সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ৩ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
ব্যাংক লুট, শেয়ার বাজার লুট ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে নেয়া ওই মাফিয়া চক্র সহজে এদেশ ছেড়ে যাবে না বলেও মন্তব্য করেছেন এই চিন্তাবিদ।
ফরহাদ মজহার বলেন, দেশ আজ পুরোপুরিভাবে একটি ফ্যাসীবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এর পরিবর্তন আবশ্যক। এই ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্যের কোন বিকল্প নাই।
একশ্রেনীর সাংবাদিকদের সরকারের সাথে আতাতের নিন্দা জানিয়ে এই কলামিস্ট আরও বলেন, সাংবাদিক হিসেবে যতই নিজেদের নামডাক থাক না কেন, যারা সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছেন তারা সন্ত্রাসী ছাড়া আর কিছুই নন।
বাংলাদেশের মানুষ দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে এখনও সতর্ক নয় মন্তব্য করে ফরহাদ মজহার বলেন, অনেকেই হয়তো ধারণা করছেন আমেরিকা অনেক কিছু করে দিবে, কিন্তু এটা একেবারেই ভুল ধারণা। আমেরিকার বিদেশ নীতিতে কোন পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দিশাই বিশওয়াল সেই কারণেই তার চলমান ঢাকা সফরের সময় বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে যদিও গ্রহণযোগ্য কোন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় আসেনি।
তিনি বলেন, আস্তিক-নাস্তিকের নামে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ভুলে ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশ বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মধ্যে পড়বে।
ফরহাদ মজহার বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়েও ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে সমালোচনা করা যায়, আবার কেউ ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করলেই তাকে হত্যা করতে হবে এমন কোন যৌক্তিকতা নেই।
সমাবেশে সরকারকে উদ্দেশ্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ভিসি ড. এমাজ উদ্দিন আহমদে বলেছেন, আপনাদের শুভবুদ্ধির উদায় হোক। যে কয়েক দিন ক্ষমতায় আছেন সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করুন। কারণ জনগণের জন্য কাজ করলেই দেশে শান্তি ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, মুক্ত চিন্তার চর্চা ও সংবাদের স্বাধানীতা যেখানে বন্ধ, মানবতা যেখানে অনুপস্থিত সেখানে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকে না।
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মানুষ প্রচণ্ড ভয় পেলে যেভাবে প্রলাপ বকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কথা বার্তা অনেকটাই সেই ধরনের।
তিনি বলেন, দেশে একটি গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে। এদেশের মানুষ পাকিস্তানের শাসন মানতে পারেনি বলেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। কাজেই মানুষ দিল্লীর শাসনও মানবে না। এটা সরকারকে মনে রাখতে হবে।
ডাক্তার জাফরুল্লাহ জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে অতীতের ভুলের বিষয়ে পরিস্কার স্বীকৃতি দিয়ে রাজনীতি করারও আহবান জানান। আবার অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য যারা চেষ্টা করেছিলেন তাদের দেশপ্রেম নিয়েও মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. জাফরুল্লাহ আরও বলেন, বাংলাদেশে একজন শ্রমিক ও একজন সর্বোচ্চ বেতনধারীর মধ্যে যে বেতন বৈষম্য রয়েছে তা পৃথিবীর কোন দেশে নাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশ সরকারকে কত টাকা ট্যাক্স দেয় এবং আমেরিকার সরকারকে কত ট্যাক্স দেয় অবিলম্বে তা প্রকাশ করার জন্যও সরকারের প্রতি আহবান জানান ডা. জাফরুল্লাহ।
সমাবেশে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন বলেন, সরকার দেশে একটি ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে। মানুষ আজ কথা বলতে পারছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে একদিন বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটবে, আর তা রুখতে পারবে না সরকার।
তিনি সরকারকে ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাচতে হলে অবিলম্বে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়াসহ মানুষের বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ দেন।
সাংবাদিক নেতা ও জাতীয় পেশাজীবী পরিষদের আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেন, দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরকারের গুনকীর্তনে এতটাই মশগুল যেন দেশে কোন সমস্যাই নেই।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রন করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন আইউব খান, মোনায়েম খান, শেখ মুজিব ও এরশাদসহ অনেকেই। কিন্তু শেষ পরিণতি কারো ভালো হয়নি।
গাজী বলেন, দেশে এখন একদলীয় শাসন চলছে। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই হামলা, মামলা অথবা ফাসির দড়িতে ঝুলতে হচ্ছে। দেশে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
তিনি বলেন, ক্ষমতার মোহে অন্ধ এই সরকারকে মানুষ নির্বাচিত করেনি, সমর্থনও করে না। একদিন না একদিন দেশ ঘুরে দাড়াবেই।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ বলেন, দিগন্ত টেলিভিশনের মূল সমস্যা হলো তারা সত্য ও সুন্দরের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এবং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চ্যানেলে পরিণত হয়েছিল।
তিনি বলেন, কুৎসিত আ্ওয়ামী জাহিলিয়াতের বাংলাদেশে সত্য ও সুন্দরের আশা করাটাই ছিল দিগন্ত টেলিভিশনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলসের যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে আখ্যায়িত করে এম আবদুল্লাহ বলেন, দেশের গণমাধ্যমের ওপর ইতোমধ্যেই আরোপিত নিয়ন্ত্রনকে আরও সুনিশ্চিত করতে সরকার জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ও মিডিয়া মনিটরিং সেল গঠন করতে যাচ্ছে। অথচ গোয়েবসের উত্তরসুরী ইনু ক্রমাগত মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন।
দৈনিক নয়াদিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুদ মজুমদার বলেন, এভাবে চলতে থাকলে মানুষের ধৈর্যের বাধ একদিন ভাঙবেই। আর সেটা কারো জন্যই ভালো হবে না।
সমাবেশে সাংবাদিক নেতা এম এ আজিজ বলেন, সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৫৪ ধারার যখন যাকে খুশি আটক করে নির্যাতন করছে। নিজেদের ইচ্ছামতো মামলা সাজিয়ে প্রহসনের বিচার করছে।
তিনি বলেন, একদিকে গুম-খুন-অত্যাচার-নির্যাতন করে বিরোধী দলকে মাঠের বাইরে রাখা হচ্ছে, অপরদিকে সম্প্রচার নীতিমালার নামে গণমাধ্যমের কণ্ঠ পুরোপুরি রোধ করার অপচেষ্টা চলছে। দেশে যেন তুঘলকী শাসন চলছে।
আজিজ বলেন, বন্ধুপ্রতীম দেশ অসন্তুষ্ট হয় এমন কোন সংবাদ পরিবেশন করা যাবে না মর্মে খসড়া সম্প্রচার নীতিমালায় বলা হয়েছে।
সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে এই সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে অশান্ত সীমান্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, সেখানে প্রতিনিয়ত নিরীহ বাংলাদেশীদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ। ভারতের অসন্তুষ্টির ভয়ে আমরা কি সেই সংবাদ পরিবেশন করবো না?
এম এ আজিজ বলেন, একের পর এক ৫৪ টি অভিন্ন নদীতে বাধ নির্মানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে, ভারতের অসন্তুষ্টির ভয়ে আমরা কি সেই সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকবো?
জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে হটিয়ে দেয়া সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, হিটলারের নাৎসী বাহিনীর মতোই এই সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফীক রেহমানকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালানোর নিন্দা জানিয়ে আবদাল আহমেদ আরও বলেন, মাহমুদুর রহমানের ওপর আবারও রিমাণ্ডের নামে নির্যাতন চলছে, মিথ্যা অভিযোগে জেলে পুরে রাখা হয়েছে সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদকে, সীমাহীন নির্যাতন চলছে মাহমুদুর রহমান মান্নার ওপর।
সমাবেশে কবি আব্দুল হাই শিকদার ভারতীয় আগ্রাসন ও বর্তমান সরকারের তাবেদারীর বিরুদ্ধে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে শুনান।
সংহতি সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন, দিগন্ত টেলিভিশনের নির্বাহী সম্পাদক মাহবুবুল আলম। আরও উপস্থিত ছিলেন, দিগন্ত টেলিভিশনের ডেপুটি নির্বাহী সম্পাদক মুজিবুর রহমান মঞ্জু, প্রধান বার্তা সম্পাদক জিয়াউল কবির সুমন ও সাংবাদিক নেতা শহীদুল ইসলাম। সমাবেশে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন, দিগন্ত টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক শাহিন হাসনাত।
কেবি





