'আমি মা, আমি এক বছর আগে এখানে এসেছিলাম সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে। আজও আমি এখানে এসেছি বিচার চাইতে। আমি বিচার পেলাম না। সরকার দু'বছরেও আমার ছেলে ও বউমা হত্যার বিচার করতে পারল না। সরকার উল্টো এ ঘটনাকে আরো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।'
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের দু'বছর পূর্তিতে আয়োজিত স্মরণসভায় এসব কথা বলেন সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মুনির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউর সভাপতি শাহেদ চৌধুরী।
সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মুনির বলেন, আমি আমার ছেলে ও বউমা'র কবর জেয়ারত করতে যাইনা। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে কেন আমি কবর জেয়ারত করতে যাই না?  প্রতুত্তরে আমি সবাইকে বলতে চাই, 'হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমি কবর জেয়ারত করতে যাবো না। আমার মৃত্যুবরণ পর্যন্ত যদি সুষ্ঠু বিচার করা না হয় তবুও আমি কবর জেয়ারতে যাব না।' সাংবাদিকদের কাছে কথাগুলো বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
সাগরের মা সালেহা মুনির ছেলের স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমার ছেলে সাগর কৃষ্ণচূড়া গাছ খুব পছন্দ করতো। আমি আশাবাদী মানুষ আমার ছেলে হত্যার বিচার হবেই। আমার কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি আর ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যেদিন হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কেবল সেদিনই আমি কবর জেয়ারতে যাব। সেদিন ছেলের কবরের পাশে কৃষ্ণচুড়া গাছ লাগিয়ে দোয়া করব। আর ওদের উদ্দেশে দোয়া করে বলবো তোমাদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছি বলেই তোমাদের কবরের পাশে এসে দাঁড়াতে সাহস করেছি।'
তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, তোমরা আমার দুই সন্তানের হত্যার বিচারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন করেছ। মাঝ পথে তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়েছিলে। আমার ভালো লাগছে। আজ হত্যার দুই বছরে মাথায় তোমরা মত নির্বিশেষে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছ।
তিনি বলেন, আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই, তোমাদের প্রতি বড় অনুরোধ তোমরা এ আন্দোলন বন্ধ করো না। তোমরা সবাই সর্বাত্মক এমন গণআন্দোলন গড়ো তোলো যাতে সরকার এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে বাধ্য হয়। খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
তিনি বলেন, পিতা-মাতাহারা সাগরের অসহায় মুখের দিকে তাকালে নিজেকেও অসহায় বোধ করি। মাঝে মাঝে মেঘ যখন আমাকে বাবা-মার সম্পর্কে জানতে চায় তখন ভাষাহীন হয়ে পড়ি। কোনো উত্তর দিতে পারি না। আসলে উত্তর তো দেয়ার কথা যারা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দায়িত্ব নিয়েছে।
স্মরণ সভায় মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, প্রশাসনকে এই মামলার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, আমরা রাত-দিন পরিশ্রম করছি আসামিদের সনাক্ত করার জন্য। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, 'আর কতদিন লাগবে? হত্যার ২৪ মাস পার হলেও কেন তদন্ত এগুচ্ছে না।'
হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের নামে সরকার প্রহসন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনীদের গ্রেফতার করার কথা। নিশ্চয় হত্যাকারীদের সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল, তাই তিনি ৪৮ ঘণ্টার কথা বলতে পেরেছিলেন। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টার বদলে দুই বছর পেরিয়ে গেলো কিন্তু তদন্তই শেষ হলো না।
মেঘের মামা নওশের আলম রোমান আরও বলেন, সাড়ে ৭ বছরের মেঘ এখন সাংবাদিকদের ছবি অঙ্কন করে দেখিয়ে বলে তোমাদের দু'জন সাংবাদিক মরে গেছে তোমাদের কেমন লাগছে! এমন প্রশ্নে কে বা উত্তর দিতে পারে!
স্মরণসভায় আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের মহাসচিব ওমর ফারুক, ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী, ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ আকন প্রমুখ।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নেসা রুনি।
এ হত্যাকাণ্ডের পর তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত এবং গ্রেফতারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু দুই বছরেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়নি।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর [/b]