জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সহ সারাদেশের প্রেসক্লাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ঢুকতে দেওয়া হবেনা বলে ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল।
রবিবার দুপুরে সচিবালয়ের সামনে এক সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ‘গণমাধ্যমের গণশত্রু’ আখ্যা দিয়ে তার অপসারণ দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)’র একাংশ।
বুলবুল বলেন, ক্ষমতায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। কিন্তু তার নৌকার মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় কিছু ‘কাউয়া’ ঢুকে পড়েছে যারা এ চেতনার সাথে যায়না।
তিনি বলেন, একদিকে প্রধানমন্ত্রী ৫০১ ও ৫০২ ধারা জারি করে সাংবাদিকদের সম্মান দিলেন, অন্যদিকে আরেকটা আইন জারি হলো ৫৭ ধারা, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি মনে করেন আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপের মধ্যে কিছু আছে, তাহলে আপনাকে গ্রেফতার করবেন। ধারাটি জামিন অযোগ্য, জরিমানা এক কোটি টাকা, হতে পারে সাত বছরের জেল।
আর এই ৫৭ ধারার পক্ষে হাসানুল হক ইনু অবস্থান নিয়েছেন দাবি করে বুলবুল বলেন, এতে বুঝা যায় একদিকে প্রধানমন্ত্রী চান সাংবাদিকদের সম্মান দিতে, অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী চান ৫৭ ধারা বহাল থাকুক।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী গত চার বছরে অন্তত চারটি ইফতার পার্টিতে আমাদের সাথে বলেছেন সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড দিতে হবে। আমরা যতবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করি, তিনি বলেন সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড দিতে হবে। রাষ্ট্রপতিও বলেছেন সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড দিতে হবে। অন্যদিকে আমরা যখন তথ্যমন্ত্রীকে বলি তিনি বলেন মালিকরা নাম দিচ্ছেনা এজন্য ওয়েজবোর্ড দেওয়া যাচ্ছেনা।
বুলবুল আরো অভিযোগ করেন, গত চার বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী তার উল্টা পথে চলেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রচার আইন চান। তথ্যমন্ত্রী এমন একটা সম্প্রচার আইনের খসড়া করলেন, এ আইনের খসড়া আর সাংবাদিকদের গলায় ফাঁসি দেওয়া একই কথা। আমরা এর প্রতিবাদ করলাম, সবশেষ একটা খসড়ার বিষয়ে অমরা সমঝোতায় এসেছি। কিন্তু আজ দুই বছর ধরে কোথায় এ খসড়ার ফাইল রাখা হয়েছে আমরা জানিনা।
বুলবুল বলেন, ১৯৭৪ সালে করা মিডিয়া আইন চালু করার জন্য অমরা আড়াই বছর আগে প্রস্তাবনা তৈরি করে দিয়েছি। যে আইনটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু তথ্যমন্ত্রী সাড়া দিচ্ছেন না।
তিনি বলেন, অষ্টম ওয়েজবোর্ডের মধ্যে নানান ত্রুটি ও অসঙ্গতি ছিল, আমরা শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ কর্মসূচি দিলাম। উনি মিটিং ডাকলেন, আমরা সংশোধনীর জন্য খসড়া প্রস্তাব দিলাম, তথ্যমন্ত্রী বললেন এই মুহুর্ত থেকে কাজ শুরু হবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সব ফয়সালা হয়ে যাবে। বুলবুল বলেন, এই ১৫দিন পনের মাস গেল, তিন বছর গেল এখন পর্যন্ত এটি তিনি করলেন না। এসকল কাজ প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন কিন্তু তথ্যমন্ত্রী চাননি । সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর চেতনার সাথে এটা যায় না।
বুলবুল বলেন, আজ আমরা তথ্যমন্ত্রীর যে অপসারণ চাই এটা সরকারের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ নয়। বরং প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে থেকে তার চিন্তার বিরুদ্ধে যে কার্যক্রম তথ্যমন্ত্রী করছেন সেটা তার নজরে আনা।
তিনি বলেন, আমরা যারা আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি তারা গণমাধ্যমের পক্ষে, সাংবাদিকদের পক্ষে এবং প্রধানমন্ত্রীর চেতনার পক্ষে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর চেতনার বিরুদ্ধে যারাই অবস্থান নিবেন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব তার মুখোশ উন্মোচন করা। সেটা রাজপথে যদি কেউ করে, নিশ্চয়ই সেটা আমরা রাজনৈতিকভাবে করবো। আর সরকারের মধ্য থেকে কেউ করে থাকলেও আমরা তার মুখোশ উন্মোচন করবো এবং সেজন্যই আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি।
বুলবুল বলেন, কয়েকদিন আগে যখন আমরা ওয়েজবোর্ডের বিষয়ে বললাম, তথ্যমন্ত্রী বলছিলেন গত অক্টোবর থেকে ওয়েজবোর্ডের কাজ চলছে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি একটা সরকারের সম্পূর্ণ সময়ে যদি মাত্র একটা কাজ হয়, তাহলে কি চলে? তাহলে বুঝা যায় তারা অযোগ্য । শুধু সেনাপতি শক্তিশালী হলে যুদ্ধে জয় করা যায় না। তার আশে পাশে যারা থাকেন তাদেরকেও কৌশলী হতে হয়।
দাবি’র বিষয় তুলে ধরে বুলবুল বলেন, সাংবাদিকদের জন্য নবম ওয়েজবোর্ড দিতে হবে।
মন্ত্রীর সাথে মালিক পক্ষের বৈঠকের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাছে খবর আছে, আগামী মঙ্গলবার মালিকদের সাথে তথ্যমন্ত্রীর বৈঠক আছে, উনারা চান সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড যেন না হয় ।
বুলবুল বলেন, আপনারা গণমাধ্যম পরিচালনা করবেন, আর গণমাধ্যম আইন মানবেন না, এটা হতে পারেনা।
ইউনিয়নের ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনতো অনেকে নতুন মালিক হয়েছেন, তবে বহু পুরানো মালিকও আছেন। তারা জানেন ইউনিয়ন কি। মালিকদেরকে পুরাতনদের কাছ থেকে ইউনিয়নের বিষয়ে জেনে নেওয়ারও পরামর্শ দেন এই সাংবাদিক নেতা।
তিনি বলেন, মালিকদেরকে বলি আপনারা তথ্যমন্ত্রীর সাথে চা-পানি খান অসুবিধা নাই, তবে প্রত্যেকের ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে। আমাদের ধৈর্য্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই আমরা তথ্যমন্ত্রীর অপসারণ দাবি করছি। সুতরাং আমরা যার অপসারণ চাচ্ছি তার সাথে বৈঠক করে খুব বেশি কিছু করতে পারবেন বলে মনে করিনা । তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য একটাই ওয়েজবোর্ড ঘোষণা ছাড়া অন্য কোন ঘোষণার সঙ্গে আমরা নাই।
তিনি মালিকদের উদ্দেশ্য করে আরো বলেন, আপনারা নাম দিচ্ছেন না, জেনে রাখুন আমাদের এ মিছিল মালিকদের অফিসও ঘেরাও করবে। আমরা টেবিলে বসেই সমস্যা সমাধান করতে ছেয়েছিলাম। কিন্তু আপনারা আমাদেরকে রাজপথে ঠেলে দিয়েছেন। সুতরাং যারা ষড়যন্ত্র করছেন আপনাদের বিরুদ্ধেও আমাদের আন্দোলন দাঁড়াবে।
বুলবুল বলেন, সারাদেশে আমাদের আন্দোলন চলছে, অনেকে প্রশ্ন করেন আমাদের আন্দোলনে কি থাকবে? আমি স্পষ্ট বলতে চাই তথ্যমন্ত্রী আপনার সচিবালয় আছে, আপনি সেখানে থাকেন। আমাদের প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আপনাকে ঢুকতে দিবনা। বাংলাদেশের কোন প্রেসক্লাবে তথ্যমন্ত্রী যেতে পারবেন না। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশের সকল সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের কোন অনুষ্ঠানে আসতে পারবেন না।
বুলবুল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, যারা সচিবালয় বিট করবেন, আপনারা তথ্য মন্ত্রনালয়ের দিকে যাবেন না। সুতরাং তথ্যমন্ত্রী বসে বসে আপনি বিটিভিতে বক্তব্য দেন। কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেল আপনার বক্তব্য প্রচার করবেনা। পত্রিকাগুলোতে আমাদের সাংবাদিকরা কাজ করেন, তারা আপনার কোন খবর ছাপবে না। পরে তিনি বলেন, একটু আওয়াজ দিলাম! কবে থেকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে। সেটা আমরা আলোচনা করছি।
তিনি বলেন, আমরা সারাদেশের সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছি, নিজেরাও বসেছি উল্লিখিত কর্মসূচি নিয়ে, আমরা আগাবো । সামনে শোকের মাস উপলক্ষে ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত আমরা কোন কর্মসূচি দিবনা।
৫৭ ধারার বিষয়ে বুলবুল বলেন, যে আইন দিয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা নষ্ট হয় সেটা আপনারা কেন রাখবেন। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী বলেছেন, ১৫ আগষ্টের মধ্যে এ আইনের বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিবেন। আমরা সময় দিচ্ছি।
এই সাংবাদিক নেতা বলেন, ১৫ আগষ্টের মধ্যে যদি আমাদের সব দাবি মানা না হয়। ১৬ আগষ্ট থেকে আমরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবো।
মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, বিএফইউজের মহাসচিব উমর ফারুক, সাবেক মহাসচিব আব্দুল জলিল ভুঁইয়া, ডিইউজের একাংশের সভাপতি শাবান মাহমুদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সেক্রেটারি মোরসালিন নোমানী, সাব-এডিটর কাউন্সিলের সভাপতি এনামুল হক, অন্য অংশের সভাপতি কে এম শহীদুল হক, সহ সভাপতি আতিকুর রহমান চৌধুরী, নিউজ পেপার এন্ড মিডিয়া এমপ্লয়িজ এসোসিয়েশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোবারক হোসেন, ডিইউজের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান মিয়া, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা মিনু, ডিইউজে নেতা মাহমুদুর রহমান খোকন প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী।





