মিজানুর রহমানপটুয়াখালীর বাউফল থানা। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১০টা। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে প্রথম আলোর উপজেলা প্রতিনিধি মিজানুর রহমানের ওপর শুরু হয় পুলিশের নির্যাতন। আগে তাঁর হাত পেছনে নিয়ে পরিয়ে নেওয়া হয় হ্যান্ডকাফ।

কোনো দাগি আসামি নন মিজানুর। তুচ্ছ ঘটনায় গ্রেফতার করে মিথ্যা অভিযোগে করা মামলায় ফাঁসিয়ে থানায় আটকে তাঁর সারা শরীরে মোটা রোলার দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটায় পুলিশের ওই দল। জ্ঞান না হারানো পর্যন্ত চলতে থাকে পেটানো। তাতেও রেহাই হয়নি। জ্ঞান ফিরলে শুরু হয় আবারও। এভাবে কয়েক দফায়।

গতকাল শুক্রবার পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন ব্যানার্জির নেতৃত্বে সাংবাদিকেরা দেখা করতে গিয়ে মিজানুরের মুখে নির্যাতনের বিবরণ শুনে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। কেউ কেউ রাগে-ক্ষোভে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

মিজানুরের বক্তব্যমতে, নির্যাতনকারী পুলিশের এই দলে ছিলেন পটুয়াখালীর সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাহেব আলী পাঠান, বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নরেশ চন্দ্র কর্মকার এবং আরও দুই সদস্য। তবে সহকারী পুলিশ সুপার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুজনই নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

গত মঙ্গলবার এ ঘটনার তিন দিন পরও গতকাল মিজানুরের সারা শরীরে ছিল জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত। কারা হাসপাতালে এখন তার চিকিৎসা চলছে। নির্যাতনের রাত থেকে এখনো ঠিকমতো হাটতে পারছেন না তিনি। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলটি ফুলে নীল হয়ে আছে। অন্য কয়েদিদের সহায়তায় খাওয়া, টয়লেট ও গোসল করছেন বলে জানান মিজানুর।

পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন ব্যানার্জি বলেন, ‘মিজানের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে, সেটা অমানবিক। আমরা সাংবাদিক সমাজ এর ধিক্কার জানাই। অনতিবিলম্বে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

যোগাযোগ করা হলে পটুয়াখালী পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ মোসফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন তিনি। পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এইচ এম আজিমুল হক বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিবাদ কর্মসূচি: আগামীকাল রোববার সকাল ১০টায় পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে জেলা প্রেসক্লাব। কর্মসূচিতে বিভিন্ন উপজেলার সাংবাদিকসহ বিভাগীয় পর্যায়ের সাংবাদিক নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

একই দিন এবং একই সময় বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে জেলা রেডিও টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম, বন্ধুসভা যৌথভাবে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিয়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।

নিন্দা ও ক্ষোভ: নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল, সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জিসহ অন্য সদস্যরা।

এক বিবৃতিতে বরিশাল প্রেসক্লাবের নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন বাউফল থানায় কর্মরত থেকে ওসি নরেশ কর্মকার সেখানে নিরীহ মানুষের আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন। বিবৃতিতে নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করে শাস্তির দাবি জানানো হয়।

নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সাংবাদিকেরা। ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে কলাপাড়া প্রেসক্লাব, কলাপাড়া রিপোর্টার্স ইউনিটি ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাব।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: গত মঙ্গলবার রাতে বাউফল উপজেলার কালাইয়ার ল্যাংরা মুন্সির পোল এলাকায় একটি যানজটের মধ্যে পড়েন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. হালিম খান ও সাংবাদিক মিজানুর। একপর্যায়ে হালিম খান মিজানুরকে গালি দেন। এর প্রতিবাদ করেন মিজানুর। তখন দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হয়। পরে পরিচয় জেনে দুজনেই মিটমাট করেন এবং দোকানে বসে একত্রে চা খান।

এরপর মিজানুর নিজ মোটরসাইকেলে হালিম খানকে তার কর্মস্থলে পৌঁছে দেওয়ার পর মারধর এবং সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে বাউফল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। রাতেই তাকে গ্রেফতার করে থানায় আটকে চালানো হয় ওই নির্যাতন। অচেতন হয়ে পড়লে আহত মিজানুরকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু নির্যাতনের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় সেখানে আগেই সাংবাদিকেরা উপস্থিত হন। তাদের দেখে তাকে চিকিৎসা না করিয়ে আবার থানায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে গভীর রাতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসক এনে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। পরের দিন আদালতে তুলে জেলহাজতে ঢোকানো হয়।

মিজানুরের বাবা আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের অনিয়ম তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তার ছেলেকে ধরে নির্দয়ভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এর আগেও তাকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার: মিজানুরকে নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার সাহেব আলী পাঠান। গতকাল রাতে ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয় থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, থানায় নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। মিজানুর তাকে জানিয়েছেন, হালিম খানের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনায় তাঁর একটি আঙুল ফুলে গেছে। থানায় মিজানুরকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি নরেশ চন্দ্র কর্মকারও। ওসি বলেন, পরিচয় জানার পর হালিম খান ও মিজানুর পরস্পর চা খেয়েছেন, এ কথা সত্য নয়। মিজানুরের ঘুষির আঘাতে আহত হালিম খান বাউফল থানায় চিকিৎসাধীন বলে তিনি জানান।

সূত্র: প্রথম আলো

জেএ