দৈনিক সংগ্রাম অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির নেতাকর্মীরা মগবাজারে পত্রিকাটির নিজস্ব কার্যালয়ের সামনে প্রথমে বিক্ষোভ দেখায়। এরপর পত্রিকা কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালায় তারা। এসময় পত্রিকাটির কয়েকটি কপি আগুনে পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা।

শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর)সন্ধ্যার পর রাজধানীর বড় মগবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, পত্রিকা অফিসের কম্পিউটার, দরজা, জানালা, চেয়ার, টেবিল ও সম্পাদক আবুল আসাদের কক্ষে ভাঙচুর চালিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এরপর তারা গেটের বাইরে সংগ্রাম পত্রিকায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। অফিসে ভাঙচুরের একপর্যায়ে সম্পাদক আবুল আসাদকে হাতিরঝিল থানা পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের প্রধান প্রতিবেক রুহুল আমিন গাজী জানান, ‘এ ধরনের সংবাদ গত ৫ বছর থেকেই ছাপা হচ্ছে। কোনো সংবাদে কেউ সংক্ষুদ্ধ হলে তারা নিয়ম মোতাবেক প্রতিবাদ দিতে পারেন। কিন্তু তা না করে হামলা ভাংচুর ও আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নাই। এটা অন্যান্য গণমাধ্যমের জন্যও হুমকি স্বরুপ’।
তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা পত্রিকার বিভিন্ন কক্ষ থেকে‘৫৮টি কম্পিউটার ও পত্রিকার ছাপানোর সব উপকরণ আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে’।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সংগ্রামের যুগ্মবার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম জানান, ‘শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মুক্তিযোদ্ধ মঞ্চ নামে একটি সংগঠনের শতাধিক কর্মী সংগ্রাম কার্যালয় ঘেরাও করে রাখে। তারা কাউকে প্রবেশ বা বের হতে দেয়নি।

পরে এক পর্যায়ে আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেসে যায় তারা। ভবনের বার্তা কক্ষ, সম্পাদনা কক্ষ, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের কম্পিউটার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভাংচুর ও তছনছ করে। তারা পত্রিকার বয়োজ্যেষ্ঠ সম্পাদক আবুল আসাদকে ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে’।
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রত্রিকাটি দেশের শহীদদের অবমাননা করেছে। দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করেছে। আমরা চাই সরকারিভাবে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হোক। পত্রিকার সম্পাদক আবুল আসাদকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার বলেন, আমরা খবর পেয়ে সেখানে পুলিশের টিম পাঠিয়েছি।
হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদ জানান, ‘কারা ভাংচুর করছে সেটা নিয়ে পরে কথা বলব।’
বিএফইউজে ও ডিইউজে নেতৃবৃন্দের উদ্বেগ ও নিন্দা
এ ঘটনায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন(বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের প্রাচীন সংবাদপত্রগুলোর অন্যতম দৈনিক সংগ্রামের মগবাজারস্থ কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা, ভাংচুর, তছনছের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই । একই সঙ্গে পত্রিকাটির বয়োজ্যেষ্ঠ সম্পাদক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আবুল আসাদকে পুলিশ ধরে থানায় আটকে রাখায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে বিএফইউজে’র সভাপতি রুহুল আমিন গাজী ও মহাসচিব এম আবদুল্লাহ এবং ডিইউজে সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, একটি সংবাদপত্র অফিসে ঢুকে কম্পিউটার, আসবাদপত্র, দরজা-জানালাসহ সবকিছু তছনছ করা ফ্যাসিবাদী আক্রমন ছাড়া কিছুই নয়। কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত সংবাদে সংক্ষুব্ধ হলে তার প্রতিবাদ জানানো এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও অধিকার রয়েছে। কিন্তু তা না করে পেশীশক্তির মহড়া কোন সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন,যারা হামলা করেছে তারা ঘোষণা দিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে করেছে। এতে ধারণা করা অমুলক হবে না যে সরকারের ছত্রছায়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েই এই বর্বরোচিত হামলা করা হয়েছে। এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা গোটা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাছাড়া কোন মামলা ও ওয়ারেন্ট ছাড়াই একজন প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ সম্পাদককে পুলিশ তাঁর অফিস থেকে যেভাবে তুলে নিয়ে গেছে তাতে গোটা সাংবাদিক সমাজ ও বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করেছে।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সম্পাদক আবুল আসাদকে সসম্মানে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টা থেকে জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে ৫০/৬০ জন যুবক মগবাজার ওয়ারলেস রেল গেট সংলগ্ন দৈনিক সংগ্রাম অফিস ঘেরাও করে হুমকিমূলক শ্লোগান দিতে থাকে। এর আগে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির নামে সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক আল-মামুনের নেতৃত্বে এ ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পত্রিকার সাংবাদিকরা যখন আগামী কালের সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য কর্মব্যস্ত ঠিক তখনই অতর্কিতে গেট ভেঙ্গে অফিসে ঢুকে একে একে সব কয়টি কক্ষে ভাংচুর চালায়। সংগ্রামের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ৫৫টি কম্পিউটার, ৩টি টেলিভিশন, সকল আসবাবপত্র, দরজা-জানালা সবকিছু ভেঙ্গে তছনছ করে। আধাঘন্টা ধরে এ তান্ডব চলার সময় পুলিশ অফিসের নিচে ছিল। পরে তারা অফিসে ঢুকে সম্পাদক আবুল আসাদকে আটক করে হাতিরঝিল থানায় নিয়ে যায়।
এএইচ





