বুধবার সার্কিট হাউসে তথ্য ভবনে ‘সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে এত স্বাধীনতা গণমাধ্যম এর আগে আর কখনোই ভোগ করেনি।’ তবে স্বাধীনতার সুযোগ যেন অপব্যবহারে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাংবাদিকতার নামে অপকর্ম যাতে না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার নামে সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক ও বিভিন্ন ‘ভুঁইফোড়’ পত্রিকায় ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। প্রতিদিন সাংবাদিকতার নামে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগ আসছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জহির উদ্দিন স্বপনের ভাষ্য, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, কাউকে হয়রানি কিংবা ব্ল্যাকমেইল করার হাতিয়ার হতে পারে না। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই স্বাধীনতা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দেশের সাংবাদিকতা পেশার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অধিকাংশ সাংবাদিকই বর্তমানে নিজেদের পেশাগত অবস্থান নিয়ে অসন্তুষ্ট। সাংবাদিকরা নিজেরাই এই পেশায় থাকলেও পেশাটির সম্মান ও মর্যাদা কাঠামোবদ্ধ করার জন্য যে ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, তা এখনো যথাযথভাবে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারও এই কাজ করতে না পারার কারণে অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে।

তথ্যমন্ত্রীর মতে, সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশা। তাই এই পেশায় দক্ষ, শিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষের প্রবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজকে টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এ খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা, আইন ও শ্রম আইনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। সাংবাদিকতা পেশাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে এবং সেখানে শিক্ষিত, দক্ষ ও জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

দেশের বড় বড় ঘটনার নেপথ্যে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতেও বড় সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, এখনো করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। তাই এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।

রাজনীতি ও সাংবাদিকতার মধ্যে ক্ষমতার একটি সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি হচ্ছে জনগণের সেবা করার জন্য ক্ষমতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে সেই ক্ষমতা জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে সাংবাদিকদের।

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের যেমন ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি সেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাও সাংবাদিকদের রয়েছে। রাজনীতিবিদরা জনগণের কল্যাণে ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান, আর সাংবাদিকদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই ক্ষমতা সত্যিই জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা অনুসন্ধান ও প্রশ্ন করা।

তবে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করে তিনি বলেন, রাজনীতির নামে ক্ষমতা যদি পারিবারিকীকরণ, কুক্ষিগতকরণ কিংবা অপরাধীদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে জনগণ তা মেনে নেয় না।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা এসবের প্রতিবাদকারীদের গুম-খুনের মতো কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার জনগণ কখনোই মেনে নেয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি ক্ষমতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া হলেও সেই ক্ষমতা যদি সঠিকভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে জনগণই একসময় ক্ষমতাবানদের প্রত্যাখ্যান করে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। তাই জনগণের সেবা করার জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন হলেও সেই ক্ষমতা যদি জনগণের সেবায় ব্যবহৃত না হয়, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তা দেখা গেছে।

সরকার ও ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা স্বীকার করলেও সাংবাদিকতার অপব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেন তথ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কেউ যদি সরকারের কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার পরিবর্তে দুর্বৃত্ত, স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিস্ট শক্তির পক্ষে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেন, তাহলে তারও পরিণতি ভোগ করতে হয়।

অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে হত্যা, গুম, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট ও অর্থ পাচারের মতো কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

তবে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় যেন কেবল প্রকৃত অপরাধীরাই চিহ্নিত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তথ্যমন্ত্রী জানান, সরকার দেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম খাতে একটি নতুন ও সুস্থ ‘ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলতে চায়। এই উদ্যোগ শুধু প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে ওভার-দ্য-টপ (ওটিটি) প্ল্যাটফর্ম—সব ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও সমন্বিত মিডিয়া ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী হিসেবে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলের সহযোগিতা পেয়েছেন। ভবিষ্যতেও সাংবাদিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী আবারও দাবি করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রেখেই একটি দায়িত্বশীল, পেশাদার ও সুস্থ সাংবাদিকতা পরিবেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

এস