জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ও সান্ধ্যকালীন কোর্সের নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের দশটি বিভাগের তত্ত্বাধানে চলছে এই কোর্স।

সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর কারণে বিভাগের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা।

এই কোর্সের মাধ্যমে কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব দেখেও না দেখার ভান করায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

অতিদ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দশটি বিভাগে চালু রয়েছে এই সান্ধ্যকালীন কোর্স। আরও কয়েকটি বিভাগ এই কোর্স চালু করার উদ্দ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানা গেছে। জাবিতে প্রথম এই কোর্স চালু করে ইনিস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ) । পরে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগ (ফিনান্স এন্ড ব্যাংকিং, মার্কেটিং, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস এবং ম্যানেজমেন্ট বিভাগ)। ইনিস্টিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), ইংরেজী বিভাগ, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (সিএসই), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ এবং গণিত বিভাগ এই কোর্স চালু করে।

অন্যদিকে লোকপ্রশাসন বিভাগও নতুন করে এই কোর্স চালু করার চিন্তা ভাবনা করছে বলে জানা গেছে।

এসব বিভাগ ঘুরে জানা যায়, এ কোর্সগুলো সাধারণত দশ মাস থেকে দু’বছর মেয়াদি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ইনিস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ) বিভাগের অধীনে এই কোর্স শেষ করতে একজন শিক্ষার্থীকে গুণতে হচ্ছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। একই ভাবে ইংরেজী বিভাগের অধীনে ২ লাখ ১৫ হাাজর টাকা, ইনিস্টিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজী (আইআইটি) বিভাগের অধীনে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধীনে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে গুণতে হয়ে প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকা এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধীনে ৮০ হাজার টাকা।


বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে সান্ধ্যকালীন কোর্স ইএমবিএ প্রোগ্রমের প্রতি কোর্সের জন্য একজন অধ্যাপক প্রতি সেমিস্টারে আয় করেন ৮১ হাজার টাকা এবং একজন প্রভাষক আয় করেন ৬৩ হাজার টাকা। একজন শিক্ষক প্রতি সেমিস্টারে একাধিক কোর্স পড়ান। এ মোটা অঙ্কের টাকার লোভে অন্যান্য বিভাগগুলোও সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করার চেষ্টা করছেন।

এদিকে শনিবার বিভাগের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে ইএমবিএ প্রোগ্রাম চালাচ্ছেন বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ শিক্ষকরা। এতে ঐ অনুষদের শিক্ষার্থীরা ৮-১০ মাসের সেশন জটে পড়েছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার শিক্ষকদের বিশ্রামের জন্য দেওয়া হলেও সেদিন তারা সবচেয়ে বেশী পরিশ্রম করে থাকেন। ফলে অন্যান্য দিন নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপর খুব একটা মনোযোগ দিতে পারছেন না।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐ বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু হওয়ার পর থেকেই শিক্ষকরা ঐসব কোর্সের দিকেই বেশী মনোযােগ দিচ্ছে। কারণ এখান থেকে তারা লাখ লাখ টাকা আয় করছে। ফলে তাদের ক্লাস ও পরীক্ষা ঠিক মতই হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। এতে আমরা ভয়াবহ সেশন জটের মুখোমুখি হচ্ছি।

সান্ধ্যকালীন কোর্সের বিষয়ে সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ আলী বলেন, “ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয় তা দিয়ে একটি বিভাগ চালানো সম্ভব হয় না। আর এসব কোর্সের টাকা দিয়েই বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিকই আমরা নিয়ে থাকি। স্বভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে এসব কোর্স পরিচালনার বিষয়টি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।”

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার সভাপতি তন্ময় ধর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির অজুহাতে কতিপয় শিক্ষক ব্যবসায়িক স্বার্থে এই কোর্স চালু করেছেন এবং বিভাগের উন্নয়নের নামে এসব টাকা নিজেদের পকেটে ভরছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে জিম্মি থাকায় তারা এরা কোন প্রতিবাদও করতে পারে না। এসব বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মোহাম্মদ আলী বলেন, “এসব বিষয়ে বিভাগগুলোই ভালো বলতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তারা আয়ের শতকার বিশ ভাগ দিয়ে থাকে তাই কর্তৃপক্ষ তাদের সার্টিফিকেট দেয়।”


শিক্ষক মঞ্চের মুখপাত্র রায়হান রাইন বলেন, এখানে কেউ পড়বে বিনামূল্যে আবার কেউ পড়বে টাকা দিয়ে, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। মাত্র ২০ শতাংশ টাকা প্রশাসনকে দিয়ে কিছু শিক্ষক এরকম ব্যক্তিগত বাণিজ্য করতে পারেন না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের পরীক্ষার বিধিমালা পালন করছেন না, সেখানে তারা কিভাবে সার্টিফিকেট দেয় বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি। 
এ বিষয়ে উপ- উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা বলেছি আমাদের শিক্ষর্থীদের অবহেলা করে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালানো যাবে না। তবে কোন বিভাগের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।”

ওএফ