রবিবার (২১ জুন) বেলা ১১টায় শুরু হওয়া এ কর্মসূচি দুপুর ২টায় শেষ হয়। দৈনিক জনকণ্ঠ সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারি ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বলেন, ‘শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকে শক্তিশালী করতে জনকণ্ঠ যে ভূমিকা পালন করেছিল, তার ধারাবাহিকতা এখনও শেষ হয়নি। পলাতক হাসিনা ও তার দোসরদের ইন্ধনে বাংলাদেশপন্থী সাংবাদিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক বেআইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। গণহারে ছাঁটাই, শোকজ এবং অফিস বন্ধ করে কর্মীদের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। অবিলম্বে এসব সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সমাজ জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে।’
তিনি ছাঁটাইকৃতদের ছাঁটাইপত্র প্রত্যাহার, শোকজ নোটিশ বাতিল, বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ, হয়রানি বন্ধ এবং পত্রিকা অফিস খুলে দেওয়ার দাবি জানান।
এরপর বক্তব্য দেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন। তিনি বলেন, ‘জনকণ্ঠের কুকর্মের ইতিহাস অনেক পুরনো। অতীতে ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তারা সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালিয়েছে। আজও সেই সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। সাংবাদিকদের চাকরি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ এখনও রয়েছে। কিন্তু যদি কর্তৃপক্ষ অনড় অবস্থানে থাকে, তাহলে এমন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে যাতে জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘অনেক সাংবাদিক এই প্রতিষ্ঠানের নির্যাতন, বঞ্চনা ও মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন। আমরা আর কোনো সহকর্মীকে এভাবে নিপীড়নের শিকার হতে দেব না।’
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি রাশেদুল হাসান জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের ছাঁটাই প্রত্যাহার ও সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, ‘আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছাঁটাই, শোকজ, হয়রানি এবং অফিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে। সাংবাদিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সমাজ জনকণ্ঠ কার্যালয় ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে। আওয়ামী লীগের দোসর এবং ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে জনকণ্ঠকে আর ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন সময় এসেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার।”
দৈনিক জনকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক ও ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনির জারিফ বলেন, “জনকণ্ঠের সাংবাদিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় চলছে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এটি পুরো গণমাধ্যম শিল্পের জন্য হুমকি। বছরের পর বছর যারা এই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রেখেছেন, আজ তাদেরই রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা শ্রমিকের ঘাম শুষে খায়, সাংবাদিকদের অধিকার হরণ করে, তাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অবিলম্বে অফিস খুলে দিতে হবে, ছাঁটাই ও শোকজ প্রত্যাহার করে দৈনিক জনকন্ঠ নিয়মিত চালুর ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষ প্রতিনিধি ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ জসিম বলেন, “সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে, চাকরিচ্যুত করে কিংবা প্রশাসনিক নিপীড়নের মাধ্যমে সত্যের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলন দমন করবে, তবে তারা ভুল করছে। সাংবাদিক সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে জানে।”
তিনি বলেন, “এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; এটি ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
দৈনিক জনকণ্ঠের ডেপুটি চিফ রিপোর্টার ইসরাফিল ফরাজী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম দেওয়া সাংবাদিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। শ্রম আইন, ওয়েজ বোর্ড এবং সাংবাদিকদের মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা সংঘাত চাই না, ন্যায়বিচার চাই। কর্মস্থলের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সংবাদপত্র শিল্পের জন্য অশনিসংকেত। আমরা সকল সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।”
বক্তারা অভিযোগ করেন, জনকণ্ঠের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় এমন কিছু ব্যক্তি সক্রিয় রয়েছেন যারা আওয়ামী লীগপন্থী গোষ্ঠী ও বিদেশি প্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক সাংবাদিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন।
তারা অবিলম্বে ছাঁটাই ও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহার, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং পত্রিকা অফিস খুলে দেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় জনকণ্ঠ কার্যালয় ঘেরাও, বিক্ষোভ ও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।
পরে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি প্রেসক্লাব এলাকা প্রদক্ষিণ শেষে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়।
এস