রাজধানীতে সংবাদপত্রে নিয়োগের নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। প্রতারক চক্রটি নগরীর দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটিসহ রাস্তা-ঘাটে সাংবাদিক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি লাগিয়ে অভিনব প্রতারণা করছে।
সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেয়ার নামে ওই প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অনেককে আবার নিয়োগ দেয়া হলেও তাদেরকে জড়ানো হচ্ছে প্রতারণামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে।
দিনে দিনে বাড়ছে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম। চাঁদাবাজি, প্রতারণাসহ উঠছে নানান অভিযোগ। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধড়া পড়লেও থেমে নেই কথিত এসব সাংবাদিকদের তৎপরতা। বিব্রত হচ্ছেন পেশাদার সংবাদকর্মীরা।
শুধু ছিনতাই নয়, সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে প্রতারণাসহ নানান অভিযোগ আসছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
অভিযোগ উঠছে প্রতারণা আর চাঁদাবাজি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া ছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে অর্থের বিনিময়ে পরিচয়পত্র প্রদান করছে প্রতারকচক্র।
সরিজমিনে দেখা গেছে, নগরীর পল্টন, ফকিরাপুল, শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী রোড, মালিবাগ ও মগবাজারের রাস্তার ধারে বৈদ্যুতিক খুঁটি, বাড়ি-ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালে ‘সাংবাদিক আবশ্যক’, ‘জরুরী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ ইত্যাদি লেখা সম্বলিত সংবাদকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপন।
এমনি একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লেখা রয়েছে, ‘কয়েকটি দৈনিক জাতীয় পত্রিকার জন্য ফটো সাংবাদিক, রিপোর্টার, মার্কেটিং অফিসার জরুরী ভিত্তিতে পুরুষ-মহিলা নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহী প্রার্থীগণকে জীবন বৃত্তান্তসহ আবেদনের সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’
নিচে দেয়া রয়েছে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর। তবে এই বিজ্ঞাপনে পত্রিকার নাম উল্লেখ না থাকলেও দৈনিক সরেজমিন বার্তা নামে অন্য বিজ্ঞাপনে পত্রিকার নাম উল্লেখ ছিল।
[b]ঘটনাস্থল : শান্তিনগর পোষ্ট অফিসের সামনে [/b]
এই প্রতিবেদকসহ কয়েকজন সাংবাদিক হেঁটে যাচ্ছিলেন শান্তিনগর পোষ্ট অফিসের সামনের রাস্তা দিয়ে। চোখে পড়ল বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাগানো ‘সাংবাদিক আবশ্যক’, ভয়ংকর সেই বিজ্ঞাপনটি। একজন বলেই উঠলেন, ‘সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা যে এতটা নিচে নামবে ভাবিনি’। উপিস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে তখন উত্তেজনা। ফোন করা হলো বিজ্ঞাপনে উল্লেখিত নম্বরে (০১৭৪৭৯৪৭৪৫০, ০১৯৭৫৫২৫৬৩২)। অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর এলো, ‘জি আমরা সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছি..আপনি এখন কোথায়...নাম পরিচয়। পরে জানালো হলো, শান্তিনগর এলাকায় অবস্থান। অপরপ্রান্ত থেকে বলা হলো, দ্রুত মৌঁচাক মার্কেটের সামনে ওভার ব্রিজের নিচে আসতে।
প্রতিবেদকসহ অন্য ৩ জন সাংবাদিক মৌঁচাকের উদ্দেশে রওনা দিলেও এরই মধ্যে ৫/৬ বার অপরপ্রান্ত থেকে দ্রুত আসার জন্য মোবাইল করা হলো।
আবার ফোন...অপেক্ষা। অপরপ্রান্ত থেকে জানালো হলো-আমি ওভারব্রিজের উপর..অপেক্ষা করুন। শেষে দেখা হলো, কথা হলো। নাম মামুন হোসেন, দৈনিক একুশের বাণী’র রিপোর্টার। মামুন এবার ইন্টারভিউ নেয়া শুরু করল, বলল, ‘কাগজপত্র ও ২ হাজার টাকা দেন। কার্ড (পরিচয়পত্র) পেয়ে যাবেন। বেতন ভালই দেয়া হবে। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘পত্রিকায় আর কে আছে?’। মামুন বলল, ‘শাহিন আলম আছে। তিনি মালিক। সবকিছু’। ০১৯৮৩৯২৬৪৭৭ নম্বরে এবার চাকুরী প্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য কথা হলো শাহিনের সাথে। প্রশ্ন ছিল, রাস্তায় বিজ্ঞাপন লাগিয়ে সাংবাদিক নিয়োগ কেন? আর পরিচয়পত্রের জন্য টাকা? অপরপ্রান্ত থেকে উত্তেজিত হয়ে শাহিন বলল, ‘ও যা বলে (মামুন) তাই শুনুন’। দেখা করতে চাইলে, শাহিন ফোন কেঁটে দেয়।
পরে মামুনকে প্রশ্ন করলে, সে জানায় স্যার আমি মাত্র ৩ দিন আগে ২ হাজার টাকার বিনিময়ে এখানে কাজ শুরু করেছি। আমি কিছু জানি না। আমাকে যেভাবে বলেছে, সেভাবে আমি ও আরো ২ জন এ কাজ করছি।
উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রতারণা চক্রের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পরে মামুনকে রমনা থানায় হস্তান্তর করে।
মামুন আরো জানায়, ‘স্যার আমার কোন দোষ নেই। অনেক কষ্ট করে বাড়ি থেকে টাকা জোগাড় করে এ কার্ড পেয়েছি।’ উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া জানে বলেও জানায় মামুন। এছাড়া তার বয়স সাড়ে ১৮ বলে জানায়। মামুনের গ্রামের বাড়ী ঝালকাঠী জেলার পশ্চিম দড়িয়াপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মোশাররফ হাওলাদার।
মামুনের পরিচয়পত্রে দেখা গেছে, তার কার্ড নম্বর ২৭। তাতে পদবী লেখা আছে ‘রিপোর্টার’। প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা রয়েছে, ১৬৩ মতিঝিল আ/এ। সেখানে ০১৯৮৩৯২৬৪৭৭ নম্বর উল্লেখ করা আছে। তবে মামুনের ভাষ্য মতে, ওই পত্রিকার অফিস, ৮৮ নিউ সার্কুলার রোড (মৌঁচাক মার্কেটের নিচে)।
এ সময় মামুনের পকেটে, হিন্দু পাত্র/পাত্রী চাই/ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিসহ বেশকিছু বিজ্ঞাপনের হাতের লেখা ড্রাফট দেখতে পাওয়া যায়।
রমনা থানার ডিউটি অফিসার জানান, তদন্ত করে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম বেড়ে গেছে। এসব ভুয়া সাংবাদিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ নগরবাসী। দেখা গেছে, এমন কিছু বখাটে তরুন বা অযোগ্যে মানুষেরা ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মোটরসাইকেলে, গাড়িতে প্রেস লেখা ব্যবহার করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রয়েছে। এ শ্রেণীর ভুয়া সাংবাদিকেরা জড়িত রয়েছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি।
এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি অনুমোদনপ্রাপ্ত তিতাস টিভির মালিকানা দাবি করে কিছুদিন আগে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। পরে ভুয়া মালিকদের পুলিশ প্রেপ্তার করে।
এছাড়া কয়েকদিন আগে গাজী টিভির লোগো ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করার সময় রমনা থানায় ধরা পড়ে কয়েকজন ভুয়া সাংবাদিক। ভুয়া সাংবাদিকদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত পেশাদার সংবাদকর্মীরা।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। অথচ দেখা যাচ্ছে, লেখাপড়ায় মাধ্যমিকের গন্ডি পার হতে পারেনি, এলাকায় টাউট হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা ঢাকাসহ জেলা শহর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন অখ্যাত-কুখ্যাত পত্রিকার পরিচয় পত্র সংগ্রহ করে সাংবাদিক বনে যায় এবং প্রশাসনে ও রাজনৈতিক মহলে উদ্দেশ্যমূলক খবরদারী করে। আর প্রশাসনে খবরদারিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ওই টাউট সংবাদকর্মীরা সহজ সরল মানুষকে ব্লাকমেইলিং করছে। সময় এসেছে এদের চিহ্নিত করার। এরা সমাজের শত্রু। এদেরকে চিহ্নিত করে মুখোশ উন্মোচন ও প্রতিহতের আহ্বান জানান তারা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নব নির্বাচিত যুগ্ন সম্পাদক গাজী জহিরুল ইসলাম টাইম নিউজ বিডিকে বলেন, এ ধরনের ভুয়া সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এদের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারনে সাংবাদিক সমাজের মান-সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে।
এ ধরনের কোন অভিযোগ পেলে সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে কোন ছাড় দেয়া হবে না বলে হুসিয়ারী উচ্চারণ করেন তিনি।
গাজী জহির বলেন, কোন সংবাদ মাধ্যম যদি প্রতারণার মাধ্যমে অসাংবাদিক তৎপরতা চালায়, তবে আইন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়া হবে।
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার নামে এ ধরনের প্রতারণা কেউ যেন করতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকতে আহবান জানান তিনি। [b]
ঢাকা, এসএমআর, ২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর [/b]
গণমাধ্যম
দেয়ালে সাংবাদিক নিয়োগের বিজ্ঞাপন! প্রতারণার নয়া কৌশল
রাজধানীতে সংবাদপত্রে নিয়োগের নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। প্রতারক চক্রটি নগরীর দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটিসহ রাস্তা-ঘাটে সাংবাদিক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি লাগিয়ে অভিনব প্রতারণা করছে। সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেয়ার নামে ওই প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অনেককে আবার নিয়োগ দেয়া হলেও তাদেরকে জড়ানো হচ্ছে প্রতারণামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে।





