সাম্প্রতিক কয়েক মাসের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে ময়মনসিংহ জংশন ও এর আশপাশের সেকশনগুলোতে লাইনচ্যুতির ভয়াবহ ও ধারাবাহিক চিত্র চোখে পড়ে:
৭ আগস্ট: গফরগাঁও রেলস্টেশনে প্রবেশের মুহূর্তে ঢাকাগামী ‘জামালপুর কমিউটার’ ট্রেনের পাওয়ারকারসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে সাড়ে সাত ঘণ্টা ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।
১৬ জুলাই: একই দিনে মাত্র ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি পৃথক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রথমে শ্যামগঞ্জ এলাকায় রেলওয়ের একটি গ্যাংকারের চাকা লাইনচ্যুত হয়ে ঝারিয়া ও মোহনগঞ্জ রুটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এর পরপরই নগরীর নতুন বাজার এলাকায় চট্টগ্রামগামী ‘বিজয় এক্সপ্রেস’-এর একটি বগির ৪টি চাকা লাইনচ্যুত হয়ে জামালপুর রুটে ট্রেন চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়।
২৪ জুন: গৌরীপুর জংশনে শ্যান্টিং করার সময় পুনরায় বিজয় এক্সপ্রেসের তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
১০ জুন: ময়মনসিংহের তিনকোনা পুকুরপাড় এলাকায় ঢাকাগামী ‘ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস’-এর পাওয়ারকার লাইনচ্যুত হয়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় ঘটে এর পরেই—উক্ত ট্রেনটি উদ্ধার করতে আসা রিলিফ ট্রেনটি নিজেই উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে।
যাত্রীবাহী ট্রেন, গ্যাংকার এবং খোদ উদ্ধারকারী ট্রেনের এমন ধারাবাহিক লাইনচ্যুতি প্রমাণ করে যে, সংকটটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত ধসের ইঙ্গিত।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্যানুযায়ী, সাধারণত একটি রেল ইঞ্জিনের (লোকোমোটিভ) স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বা কার্যকরী আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। অথচ ময়মনসিংহ রুটে নিয়মিত চলাচলকারী ইঞ্জিনগুলোর গড় বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছর। এমনকি কিছু লোকোমোটিভ রয়েছে যেগুলোর বয়স ৭০ বছর পার হয়ে গেছে!
আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া এসব জরাজীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও শত শত টন পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিনে আগুন লাগা, অতিরিক্ত গরম হয়ে চালিকাশক্তি হারানো, কিংবা হুক ভেঙে বগি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা অহরহ ঘটছে। ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান জানান, পুরোনো ইঞ্জিনগুলো তীব্র গরমে মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে। কারিগরি টিম পূর্ণাঙ্গ মেরামত করার আগেই তীব্র শিডিউল চাপের কারণে এগুলোকে আবার ট্র্যাকে পাঠাতে হয়, যা ঝুঁকির মূল কারণ।
দুর্ঘটনার পেছনে শুধু পুরোনো ইঞ্জিনই নয়, রেললাইনের জরাজীর্ণ অবস্থাও সমভাবে দায়ী। শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারবাড়ি, মোহনগঞ্জ এবং জারিয়া পর্যন্ত বিশাল রুট দীর্ঘদিন যাবত বড় ধরনের সংস্কার থেকে বঞ্চিত।
বেশিরভাগ ট্র্যাকে প্রয়োজনীয় ব্যালাস্ট বা পাথরের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। বহু জায়গায় কাঠের ও কংক্রিটের পুরোনো স্লিপার ভেঙে পড়েছে, নাট-বল্টু ও ফিশপ্লেট আলগা হয়ে গেছে। রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান জানান, ট্র্যাকে পাথর কমে যাওয়ায় রেললাইনের ওপর চাপ সইবার ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে লাইন নড়ে গিয়ে স্থায়িত্ব হারাচ্ছে এবং লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বহু গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে এখন ট্রেনগুলোকে নির্ধারিত গতির চেয়ে অনেক কম গতিতে চালাতে বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা।
ময়মনসিংহ জংশন হলো বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের সংযোগস্থল। এখানে একটি রুটে কোনো ট্রেন দুর্ঘটনাকবলিত হলে পুরো নেটওয়ার্কে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ শুরু হয়।
ইঞ্জিন ও বগির তীব্র সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ভাওয়াল মেইল, ধলেশ্বরী মেইল, মোহনগঞ্জগামী দুটি লোকাল এবং দেওয়ানগঞ্জগামী একটি লোকাল ট্রেন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। সীমিত সংখ্যক যে ট্রেনগুলো চালু আছে, সেগুলোর ওপর অতিরিক্ত যাত্রী চাপ পড়ায় বাকি ইঞ্জিনগুলোতেও দ্রুত যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
নিয়মিত এমন শিডিউল বিপর্যয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না, চিকিৎসাপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে মাঝপথে নেমে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় সড়কপথে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে চরম আর্থিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলদের চরম অবহেলা, সময়মতো ট্র্যাক সংস্কার না করা এবং মানসম্মত পাথরের অভাবের কারণে আজ এই করুণ অবস্থা। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে না পেরে সরকার কেবল জনপ্রিয়তাই হারাচ্ছে না, বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন কিছু সাময়িক মেরামত দিয়ে এই রুটের সংকট কাটবে না। তারা নিম্নোক্ত জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন:
জরুরি সংস্কার: অবিলম্বে শ্রীপুর থেকে জারিয়া-মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ট্র্যাকে পর্যাপ্ত পাথর ফেলা, নড়বড়ে ফিশপ্লেট ও স্লিপার পরিবর্তন করা।
নতুন লোকোমোটিভ সংযোজন: ৩০ থেকে ৭০ বছরের পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনের বদলে আধুনিক প্রযুক্তির লোকোমোটিভ বরাদ্দ দেওয়া।
উদ্ধারকারী ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: রিলিফ ট্রেনের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাতে উদ্ধারকাজে গিয়ে নতুন কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
ডাবল লাইন ও ডুয়েল গেজ নির্মাণ: দীর্ঘমেয়াদে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের পরিবহন ক্ষমতা বাড়াতে পুরো পথকে ডাবল লাইন ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানালেও তা বাস্তবায়িত হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত কি পুরোনো ইঞ্জিন আর জরাজীর্ণ ট্র্যাকেই যাত্রীদের জীবন বাজি রেখে চলতে হবে? এই প্রশ্নই এখন ময়মনসিংহ অঞ্চলের কোটি যাত্রীর।
এমএম