এদিকে চেয়ারম্যানের মৃত্যুর খবর শুনে তার বন্ধু বাহাদুর পুর গ্রামের জামায়াত কর্মী রফিকুল ইসলাম (৫৭) হার্টঅ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। চেয়ারম্যান মাহবুবার রহমান এবং রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় পায়রাবন্দ তথা মিঠাপুকুর উপজেলা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীয় ও স্থানীয়রা জানান, মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের পায়রাবন্দ বাজারে চেয়ারম্যানের মেসার্স মডেল মেডিকেল ষ্টোর নামে একটি ওষুধের ফার্মেসী ছিলো। ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক এবং রংপুর মডেল কলেজের সহকারী ক্লার্কের কাজকর্ম শেষে অবসর সময়ে তিনি প্রতিদিন ওই ফার্মেসীতে সময় দিতেন।

ঘটনার দিন রোববার (৫ নভেম্বর) রাত আনুমানিক ৯ টায় তিনি প্রতিদিনের মতো তার ওষুধের ফার্মেসী বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১০ হাত দুরে সামনে হত্যাকারীর ভাই হাকিমের দোকানের সামনে পৌঁছালে পিছন দিক থেকে হত্যাকারী হারুন (৪৩) তার ভাইয়ের দোকানের মাছ কাটার ধারালো বটি নিয়ে পিছনে চেয়ারম্যানের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে চেয়ারম্যান কিছু বোঝার আগেই ডান পাশের গলা বরাবর হত্যার উদ্দেশ্যে কোপ দেয়। এতে তার গলার অনেকাংশে কেটে যায়। দ্বিতীয়বার আবারো গলায় কোপ দিলে তিনি সেটি হাত দিয়ে প্রতিহত করেন এবং হাতের কব্জি পর্যন্ত কেটে যায়। এমতবস্থায় আত্মরক্ষার্থে তিনি দৌড়ে গিয়ে তার দোকানের সামনে গিয়ে পড়ে যান এবং স্থানীয়রা দ্রুতগতিতে তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি রাত আনুমানিক ১০ টার সময় মৃত্যুবরণ করেন।

চেয়ারম্যানের ওপর হামলার খবর পেয়ে দ্রুত মিঠাপুকুর থানা পুলিশ এবং রংপুর জেলা ডিবি পুলিশসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। একই সঙ্গে ইউনিয়ন এবং উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে। ঘটনার পরই পায়রাবন্দ বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা হামলাকারী হারুন মিয়াকে আটক করে এবং তার ভাই হাকিম মিয়া পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মূহুর্তেই খবর চারদিক ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ ঘটনাস্থলে হত্যাকারীর শাস্তির দাবিতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং চেয়ারম্যানের অনুসারীরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রায় দু'ঘন্টা ব্যাপী প্রশাসনের প্রচেষ্টায় হামলাকারীকে নিজ জিম্মায় নিতে সক্ষম হয় পুলিশ।

হত্যাকারী ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী যে কারণে এ হত্যাকাণ্ড : হত্যাকারী ওই ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের মৃত আজিমের ছেলে। হত্যাকারী একজন পেশাদার মাদকসেবী ছিলেন। তিনি তার বড় ভাই হাকিমের মাছের দোকানে সহযোগী হিসেবে মাছ কর্তন এবং মাছ বিক্রি করতেন। হত্যাকারী হারুন তার স্ত্রী সন্তানদের খবর নিতেন না। বেশ কিছুদিন আগে তার স্ত্রী সন্তান তাকে ছেড়ে চলে গেলে তিনি একটি সার্লিশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে দিয়েছিলেন। অভিযুক্ত মাদকসেবী হওয়ায় তার সার্লিশ চেয়ারম্যান কর্নপাত না করায় সম্ভবত এ হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘনিষ্ঠজন ও স্থানীয়দের মতে যে কারণে এই হত্যাকাণ্ড : চেয়ারম্যান মাহবুবার রহমান একজন সাদাসিধে এবং আদর্শবান এবং সৎ মানুষ ছিলেন। আওয়ামী লীগের ঘাটিতে জামাতের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি তার সততা এবং আদর্শ দিয়ে পায়রাবন্দ ইউনিয়নের মানুষের মন জয় এবং মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্মভূমি এই ইউনিয়নকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। যা দেখে কিছু স্বার্থন্বেষী মহল গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। হয়তোবা এ কারণেই কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাকে কোনো কারণ ছাড়াই মাদকসেবী হারুনকে দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বিশেষ সুবিধা নিয়েছে এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করেছেন। তাছাড়া অনেকের দাবি, হারুন চেয়ারম্যানকে হত্যার আগে অপরিচিত কয়েকজনের সাথে লম্বা সময় ধরে মাদক সেবন করেছিলেন, হয়তোবা তারাই হারুনকে প্রলোভিত করেছে এবং মাদকাসক্ত হারুনের মস্তিষ্ক বিকৃত করে এই হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করেছেন।

জানাজা এবং লাশ দাফন : চেয়ারম্যান মাহবুবার রহমানের লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্ট মর্টেম শেষে (সোমবার) দুপুর আনুমানিক ১.৪৫ মিনিটে পায়রাবন্দ বাজার সংলগ্ন বাড়িতে আসলে এলাকায় শোকের মাতম পড়ে যায়। পূর্ব ঘোষিত জানাজা নামাজের জন্য বিকাল ৩ টার পূর্বেই পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও কলেজ মাঠে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। মানুষের উপস্থিতি স্কুল মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তার গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর বিকাল ৩.২০ মিনিটে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার নামাজে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রকিবুল হাসান, উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার, মিঠাপুকুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজার রহমানসহ রংপুর জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হকসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানবৃন্দ।

এসময় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার চেয়েছেন তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা। পরে জাফরপুর গ্রামের বাড়িতে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফনকাজ সম্পূর্ণ হয়।

রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবন : চেয়ারম্যান মাহবুবার রহমান, জেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতিসহ মিঠাপুকুর উপজেলার সাবেক আমির ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে অসংখ্যবার কারাবরণ করেছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রায় ২৬ টির অধিক মামলা চলমান ছিলো। কারাবরণ অবস্থায় তার প্রথম স্ত্রী ৭ সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং দ্বিতীয় বিয়ে করলে তার দু'টি সন্তানসহ মোট ৯ জন ছেলে মেয়ে রয়েছে। তার মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংষয় প্রকাশ করেছেন ইউনিয়নবাসী।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. ফেরদৌস আলী চৌধুরী জানান, অপরাধী পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব সম্ভাবনা মাথায় রেখে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে এবং ঘটনাস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

মিঠাপুকুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানান,ইউপি চেয়ারম্যান নিহতের ঘটনায় তাৎক্ষণিক স্থানীয়দের সহযোগিতায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই হত্যার ঘটনার সঙ্গে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা এবিষয়ে আমরা তদন্ত করতেছি। নিহত চেয়ারম্যানের ছেলে বাদি হয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেছে। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

এনএইচ