গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলা বাস্তবায়নে প্রধান ছিলেন সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমন। তার বিরুদ্ধে ৮–১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন ইউএনও। সদস্যসচিব প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন সদস্য হিসেবে। উপ-জেলা চেয়ারম্যানকে উপদেষ্টা রাখা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আশ্রয়ণের ৪৩০টি ঘর নির্মাণের বরাদ্দ আসে পীরগাছায়। প্রতিটি ঘরের জন্য তিন লাখ চার হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রথম ধাপে ১১০টি ঘর নির্মাণ হয়।
২০২৪ সালের শেষে ৩২০টি ঘরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরিপত্র অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় ৫-৬ ফুট মাটি ভরাট করার কথা থাকলেও দেড়-তিন ফুট উঁচু করে ভরাট করা হয়। শ্রমিক দিয়ে মাটি ভরাট না করে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে পাইপের মাধ্যমে বালু তোলা হয়।
সরেজমিনে জানা যায়, ইউএনও নাজমুল হক সুমন শল্লার বিলে ঘর নির্মাণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজার রহমান সংগ্রাম এবং ইউএনওর আস্থাভাজন সহকারী ঠিকাদার ফালু মিয়াকে দায়িত্ব দেন। অন্নদানগর কলেজসংলগ্ন খাস জমিতেও ৫টি ঘর নির্মিত হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শল্লার বিল ভরাটের পর বাকি বালু ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে প্রায় ২–আড়াই কোটি টাকার বালু বেচাকেনা হয়। শর্ত অনুযায়ী ৪০০ বর্গফুট আয়তনের দুই কক্ষের সেমিপাকা ঘর করার কথা থাকলেও তা হয়নি।
দেখা যায়, অনেক ঘর তালাবদ্ধ। কারণ, সেসব ঘর পেয়েছেন যাদের পাকা বাড়ি আছে। তারা ঘরগুলো হাঁস-মুরগি পালনের কাজে ব্যবহার করছেন। অথচ প্রকৃত ভূমিহীনরা ঘর না পেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, আমি ভূমিহীন। ঘর পাইনি। অনেক চেষ্টা করেছি।
হরিশ চন্দ্র বর্মন জানান, ঘর পেতে ১০-৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের। ৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতাকর্মী ও ইউনিয়ন মেম্বারদেরও ঘুষ দিতে হচ্ছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি মো. আয়ুব আলী বলেন, রাজনৈতিককরণের কারণে প্রকৃত ভূমিহীনরা ঘর পাচ্ছেন না।
সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, অন্নদানগর রেল স্টেশনের পাশে ৩০০-৩৫০ পরিবার বসবাস করছে। রেল কর্তৃপক্ষ তাদের উচ্ছেদ করবে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
রেল স্টেশনের কুলি ময়দান মিয়া বলেন, রেল জায়গায় পরিবার নিয়ে থাকি। যে কোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারি। সরকারের সহানুভূতি চাই।
সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ চলে যাওয়ার পর বর্তমান কর্মকর্তা আলতাব হোসেন বলেন, সবকিছু ইউএনও নাজমুল হক সুমন জানেন। তবে ইউএনও বলেন, ড্রেজার দিয়ে ফিনিশিং করা হয়েছে। সব কাজ হয়নি।” অর্থ আত্মসাতসহ বাকি অভিযোগের জবাব তিনি দেননি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দরপত্র আহ্বান না করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, শর্ত না মানা, ঘুষের বিনিময়ে বরাদ্দ-সব মিলিয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে।
রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আব্দুল ওহাব মণ্ডল বলেন, রেল স্ট্রে ডিপার্টমেন্ট ঘরগুলো নাম্বারিং করেছে। যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারে। তখন এই পরিবারগুলো গৃহহীন হবে।
আওয়ামী লীগ সরকার প্রচার করেছিল, ৫৮ জেলা ও ৪৬৪ উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ভূমিহীন মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৯ লাখ ১০ হাজার পরিবার পুনর্বাসন পেয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প জোরেশোরে শুরু হয়।
গণঅধিকার পরিষদের জেলা সদস্য মো. খায়রুল ইসলাম ৪০ জন গৃহহীনের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক দুদককে তদন্তের নির্দেশ দেন। দুদক টিম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে।
এনএইচ