আমার এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে মোবাইল নাম্বার নিয়ে ঢাকাতে একজনের সাথে কথা বলেছিলাম। বলেছিল ঢাকায় এসে যোগাযোগ করতে।

পরে ওই বড় ভাইয়ের সহায়তায় ঢাকায় এসেছিলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে চাকরির জন্যে। কিন্তু এসে দেখি বন্দিশালা। আর এভাবেই দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলেছিলেন শফিকুল ইসলাম নামে চাকরী প্রত্যাশী।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে একটি প্রতারক চক্র শফিকুলের মত আরও ৪৫ জন যুবককে ঢাকায় এনেছিল। তাদেরকে মিরপুরের একটি বাসায় কোচিং এর নামে আটকে রাখা হয়েছিল।

সোমবার রাতে রাজধানীর পল্লবীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে এমনই চার প্রতারকসহ ৪৬ জন ভুক্তভুগী যুবককে উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

তাদেরই একজন শফিকুল ইসলাম। তার বাড়ি রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারিতে। তার বাবার নাম জবান আলী। কৃষি কাজ করেই তাদের সংসার চলে। পাঁচ ভাই বোনের মাঝে শফিকুল ইসলাম সবার ছোট।

পাশের গ্রামের দুলাল নামে একজন শফিকুলকে বলেছিল বিমান বাহিনীতে চাকরির জন্যে তার একটা পরিচিত কোচিং সেন্টার আছে। যেখানে সবাই বিমান বাহিনীর বিভিন্ন পদে চাকরি করে। তারা সরাসরি বিমান বাহিনীতে চাকরি নিয়ে দেয়। তাই দুলালের কথায় বিশ্বাস করে সে এখানে আসে।

শফিকুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে বলেন, থাকা-খাওয়া বাবদ প্রতিদিন আমার কাছ থেকে তিনশত টাকা করে নিত।

তাছাড়া চাকরি পাওয়ার পর ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর সেই জন্যে আমাদের কাছ থেকে একটি স্ট্যাম্প এবং একটি নিকাহনামাতে স্বাক্ষর নিয়ে রাখে।

আর আমাদেরকে বলেছে যে, এই চাকরি পেলে সুন্দরী মেয়েদের সাথে বিয়ে হয় আর সেই বিয়ের ব্যবস্থা তারাই করে দেয়। তাছাড়া বিমানবাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তাদের মেয়েদের সাথেই বিয়ে হয়। তাই চাকরি পাওয়ার পর যদি কেউ সেই মেয়েকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায় তাই এ স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে।

তবে প্রতারক চক্রটির কাছ থেকে জানা যায়, যুবকদের কাছ থেকে একশত টাকার ননজুডিশিয়াল স্টাম্পে ও স্বতন্ত্র নিকাহনামায় স্বাক্ষর নেয়। যেন পরবর্তিতে চাহিদা মত টাকা না পেলে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আদায় এবং টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে ব্ল্যাংক নিকাহনামায় অন্য কোন নারীর দ্বারা নারী নির্যাতনের মিথ্যা মামলা দিয়ে বিপাকে ফেলা যায়।

এই ৪৬ যুবকের মধ্যে আর একজন রাফিউল ইসলাম। বাড়ি রাজশাহী বিভারে নওগাঁতে। সে পরিচিত একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে গত ১৩ তারিখে ঢাকায় এসেছে কোচিং করবে বলে।

টাইমনিউজবিডিকে রাফিউল বলেন, ঢাকায় এসে যোগাযোগ করলে মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরে আসতে বলে। পরে ওখান থেকে একজন আমাকে নিয়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার পরে দেখি যেখানে কোচিং করানো হবে সেখানে কোন সাইন বোর্ড নাই।

আমাদের সবাইকে ওই ঘরে ২৪ ঘন্টা আটকে রাখত। তারা আমার কাছ থেকে প্রথমে তিন হাজার টাকা নিয়েছিল। আর চাকরি হলে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা হয়েছিল।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে অঞ্চল ভিত্তিক নিয়োগ হয় বলে এই চক্রটি অঞ্চল ভিত্তিক কাজ করে থাকে। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ রাজশাহী, রংপুর অঞ্চলে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল।

আর এই চক্রটিও তাই ওই অঞ্চলে তাদের বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ দেয়। যাদের মাধ্যমে তারা লোক জোগাড় করে এ কাজ করে আসছিল।

তেমনি ঠাকুরগাঁও থেকে এসেছেন মেহেদী হাসান। তার বাবার নাম মোশাররফ হোসেন। তার বাবার একটা মুদি দোকান আছে এবং এটার উপরেই তাদের সংসার টিকে আছে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সে মেঝো।

ভুক্তভূগী মেহেদী বলেন, আমি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশুনা করি। বিমানবাহিনীতে লোক নেওয়া হবে এই মর্মে গত ৩১ জুলাই পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখি। পরে দালালের কথা মতো ঢাকায় চলে আসি।

কথা ছিল আগে চাকরি পরে টাকা। মিরপুরে আসার পর জানতে পারি পরীক্ষা ছাড়াই এখানে বসে থেকেই চাকরি হয়ে যাবে। এজন্য মেডিক্যাল চেকআপও করাও শেষ। এখানেই নাকি নিয়োগপত্র পাওয়া যাবে।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে ভুক্তভুগী ওই ৪৬ যুবককে হাজির করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

সেখানে তাদের উদ্দেশ্যে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ওই সাংবাদিক সম্মেলনে ডিবি উত্তর শাখার উপ কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পল্লবী ডিওএইচএস এলাকা থেকে সোমবার রাত ৮টার দিকে ভুক্তভুগী ৪৬ যুবকসহ চার প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. সিদ্দিকুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত সিভিল স্টাফ মো. জহিরুল ইসলাম এবং দুই সহযোগী মো. স্বপন হোসেন ও মো. এনামুল হক লিটন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে শেখ নাজমুল বলেন, বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. সিদ্দিকুর রহমান বর্তমানে হোটেল রেডিসনে সিকিউরিটিতে কর্মরত আছে।

আর অবসরপ্রাপ্ত সিভিল স্টাফ মো. জহিরুল ইসলাম এখানেই সময় দেই। এরা মূলত বিমান বাহিনীর বিভিন্ন পদে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবকদের কাছ থেকে ৬ লক্ষ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ একেঁছিল।

এই লক্ষে তারা ৪৫ জন যুবককে পল্লবী ডিওএইচএস এলাকার ৯ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে কোচিং দেওয়ার নাম করে আটকে রেখেছিল। প্রাথমিক ভাবে কোচিং এর বিভিন্ন খরচ ও তাদের খাওয়া-থাকার জন্যে ৫-১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এই প্রতারক চক্রটি তাদের কাছ থেকে একশত টাকার ননজুডিশিয়াল স্টাম্পে ও স্বতন্ত্র নিকাহনামায় স্বাক্ষর নেয়। যেন পরবর্তিতে চাহিদা মত টাকা না পেলে প্রতারনার মাধ্যমে টাকা আদায় এবং টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে ব্ল্যাংক নিকাহনামায় অন্য কোন নারীর দ্বারা নারী নির্যাতনের মিথ্যা মামলা দিয়ে বিপাকে ফেলা যায়।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ নাজমুল আলম বলেন, তারা মূলত জেলা ভিত্তিক এজেন্টের মাধ্যমে লোক জোগাড় করতো। এখন যেহেতু বিমান বাহিনীতে উত্তর অঞ্চলের নিয়োগ চলছে তাই তারা উত্তর অঞ্চলেই এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে।

এরা এ কাজ কতদিন ধরে করে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটাই তাদের প্রথম ছিল। এর আগে কাউকে এরা নিয়োগ দেয়নি। তবে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে কতদিন ধরে এ কাজ করছে এবং এর আগে কাউকে নিয়োগ দিয়েছে কিনা তা জানা যাবে।

সর্বশেষ শেখ নাজমুল আলম বলেন, আটককৃত আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। যে হাসপাতাল (মিরপুর মিম হাসপাতাল) থেকে মেডিকেল রিপোর্ট করা হয় এবং যে বাড়িতে তাদের আটকে রেখেছিল তারা জড়িত আছে কিনা সকল বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত চলছে।

এমআর/এসএইচ