খাদ্যে ভেজাল ও বিষ জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ প্রতিরোধ অভিযান আরও জোরদার ও গতিশীল করতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত ৪ জানুয়ারি থেকে পরিচালিত অভিযানে আশানুরূপ ফল পাওয়ায় রোববার থেকে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে পুলিশ। শনিবার ডিএমপির মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমান টাইমনিউজকে ভেজাল প্রতিরোধে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভেজাল প্রতিরোধে ডিএমপি সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। নগরবাসীকে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করাও পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গত ৪ জানুয়ারি থেকে ডিএমপি নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ভেজাল মেশানো চক্রের অনেককে সাজা ও জরিমানা করেছে। তিনি আরও জানান, রোববার মিডিয়া সেন্টারে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ গত পাঁচ মাসে পরিচালিত অভিযানের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন। এসময় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. জিল্লার রহমান উপস্থিত থাকবেন। ডিএমপির অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, নগরবাসীর নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো প্রতিরোধে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। ডিএমপি প্রায়ই ভেজাল বিরোধী প্রতিরোধে কাজ করে। এছাড়া, পবিত্র রমজান মাস আসন্ন হওয়ায় পুলিশ তার দায়িত্ব থেকেই এ কাজ করবে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, চাল-ডাল, তেল-লবণ থেকে শুরু করে শাকসবজি, ফলমূল, শিশুখাদ্য সবকিছুতেই ভেজাল মেশানোর অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। মাছে ও দুধে ফরমালিন, সবজিতে কীটনাশক ও ফরমালিন, মচমচে করার জন্য জিলাপি ও চানাচুরে মবিল, লবণে সাদা বালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়ো, মসলায় ভুসি, কাঠ, বালি, ইটের গুঁড়ো ও বিষাক্ত গুঁড়ো রং, এমনকি ইসবগুলের ভুসিতে ভুট্টার গুঁড়ো মেশানো হচ্ছে বলেও শোনা যায়। টেক্সটাইল ও লেদারের রং মেশানো হচ্ছে সস্তা মানের বিস্কুট, আইসক্রিম, জুস, সেমাই, নুডলস ও মিষ্টিতে। মুড়িতে মেশানো হচ্ছে হাইড্রোজ, ফলে মুড়ি দেখতে চকচকে ও সাদা হয়, ফুলে-ফেঁপে বড় আকৃতি ধারণ করে। অপরদিকে, মৌসুমি ফলও পাকানো হচ্ছে রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে। দ্রুত ফল পাকাতে ও আকর্ষণীয় বর্ণের করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড আর পচন ঠেকাতে ফরমালিন। সাধারণত ছোট আকারের এক বোতল ফরমালিন এক ড্রাম পানিতে মেশানো হয়। সূত্রটি জানিয়েছে, খাদ্যে ভেজাল থাকার বিষয়টি দুইভাবে সম্পন্ন হয়। প্রথমত, অসাবধানতাবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে। দ্বিতীয়ত ইচ্ছাকৃত বা অধিক মুনাফালাভের আশায়। প্রথমটি সাধারণত জ্ঞান ও দায়িত্ব সচেতনতার অভাবে হয়ে থাকে। অসাবধানতাবশত ভেজালের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ফসলে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে বেহিসেবি বা যেনতেনভাবে পেস্টিসাইড ব্যবহার করা। এতে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল ভেজালযুক্ত হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়টি কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা করে থাকেন। এদের ধরতেই পুলিশ মাঠে নামবে। তাদের ধরে জরিমানা এবং সাজার আওতায় আনা হবে। কারণ ইচ্ছাকৃত ভেজালটি সবচেয়ে ক্ষতিকারক। এখানে অধিক মুনাফার প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে অনেক সময় এমন সব কেমিক্যাল খাদ্যে মেশানো হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। যা মেশানো হয়: বিভিন্ন ধরণের রঙ খাদ্যে রঙ মেশানো একটি অতি সাধারণ ঘটনা। খাদ্যকে আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন ধরনের রঙ মেশানো হয়ে থাকে। কপার, জিংক, ইন্ডিগোবেজড্ডাই ইত্যাদি। সাধারণত বিভিন্ন বেভারেজ বা কোমল পানীয় এবং অ্যালকোহল এমনকি খাবার সসে বিভিন্ন ধরনের রঙ মেশানো হয়ে থাকে। এমাইলাম: এগুলো এক ধরনের পলিসেকারাইড বা কমপ্লেক্স শর্করা। সসকে বেশি ঘন করার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। এটিও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। কেইন সুগার: এটি মধুর সঙ্গে মেশানো হয়। এটি শরীরকে স্থূলকায় করে দেয়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত করে, চোখ এবং স্নায়ুর মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। ইউরিয়া: চালকে আরও উজ্জ্বল করতে, মুড়িকে আরও সাদা ধবধবে করতে এবং মাছ, মাংস ও সবজি রক্ষণাবেক্ষণ করতে এটিকে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় খামারিরা গরু পালনে বিশেষ করে কোরবানির জন্য গরু স্বল্প সময়ে মোটাতাজা করতে গরুর খাবারে ইউরিয়া মিশিয়ে থাকে। ফরমালিন: সাধারণত পচনশীল খাবার যাতে সহজে পচে না যায়, অর্থাৎ অধিক সময় ধরে পচনশীল খাবার, যেমন ফলমূল (আঙগুর, আম, আপেল, কমলা, মাল্টা) মাছ, মাংস, সবজি এমনকি দুধ ও দুগ্ধজাত মিষ্টি সংরক্ষণে ফরমালিনের সংমিশ্রণ করা হয়। ফরমালিনের বিষক্রিয়ায় কফ-কাশি, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতিসহ ক্যান্সারও হতে পারে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড: এটি সাধারণত স্টিল মিলে, ওয়েল্ডিংয়ের কাজে এবং আতশবাজি বা ছোট বোমা বানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা এটিকে বিভিন্ন ফল পাকানোর কাজে ব্যবহার করে থাকে। ফল পাকার রহস্য: ফল পাকার সময় হলে প্রাকৃতিকভাবে ফলে ইথিলিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ইথিলিন ফলের এক ধরনের এনজাইম নিঃসৃত করে। এমাইলেজের কাজ হলো ফলের জটিল শর্করাকে বিভাজন করে সাধারণ শর্করা বা সুক্রোজ এবং ফ্রুক্টোজে রূপান্তরিত করা। ফলে ফল নরম ও সুস্বাদু হয়। পেক্টিনেজ এনজাইমের কাজ হলো ফলের ত্বককে নরম করা। পাশাপাশি ত্বকের ক্লোরোফিল পরিবর্তিত হয়ে ফলের রঙ বদলে পাকা বা হলুদ রঙ ধারণ করে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড যেভাবে ফল পাকায়: ক্যালসিয়াম কার্বাইড পানি বা জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও এসিটাইলিন গ্যাস সৃষ্টি করে। এই এসিটাইলিন গ্যাস ইথিলিনের মতো কাজ করে। ফলে সহজেই আমসহ যে কোনো কাঁচা ফল পেকে যায়। ক্যালসিয়াম কার্বাইড দামে খুব সস্তা হওয়ায় দেশের ফল ব্যবসায়ীরা অজ্ঞতাবশত বা অতি মুনাফার লোভে সহজলভ্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে ফল পাকিয়ে থাকে। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বিষক্রিয়া : সাধারণত পানিতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড মিশিয়ে সেই পানিতে ফল ভেজানো হয়। ক্যালসিয়াম কার্বাইড পানির সঙ্গে মিশে এসিটিলিন নিঃসৃত করে ফল পাকিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ফলের ত্বক ভেদ করে ফলের ভেতরে শাসে ঢুকে যায়। এই ক্যালসিয়াম কার্বাইডে মারাত্মক বিষ হিসেবে মিশ্রিত থাকে আর্সেনিক ও ফসফরাস। এই আরসেনিক ও ফসফরাসও ফলের ভেতর ঢুকে যায়। ফল পাকার পরও ভেতরে এই আর্সেনিক ও ফসফরাস থেকে যায়। ইথোপেন: বর্তমানে দেশে ইথোপেন স্প্রে করে আনারস পাকানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে আনারস ক্ষেত থেকে কেটে আনার ২-৩ দিন আগে বাগানে আনারসের গায়ে সরাসরি ইথোপেন স্প্রে করা হয়। এখানেও ইথোপেন আনারসের গায়ে ঢুকে যায়। ওই আনারস ট্রাকভর্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এসব ভেজাল খাবার খেয়ে বেড়ে যাচ্ছে নতুন নতুন রোগ ও আক্রান্তের সংখ্যা। জনস্বাস্থ্যের জন্য এ অবস্থা এক মারাত্মক হুমকি। প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে লিভার, কিডনি, হৃদরোগ, ক্যানসারসহ নানা রকম জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব। [b]ঢাকা: কেএ ৮ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)//[/b]
অপরাধ
জোরদার হচ্ছে ডিএমপির খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ অভিযান
খাদ্যে ভেজাল ও বিষ জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ প্রতিরোধ অভিযান আরও জোরদার ও গতিশীল করতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত ৪ জানুয়ারি থেকে পরিচালিত অভিযানে আশানুরূপ ফল পাওয়ায় রোববার থেকে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে পুলিশ।





