মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের চূড়ান্ত রায় আজ।

সকাল ৯টায় প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ রায় ঘোষনা করবেন। কোর্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আজকের কার্যতালিকা বা কজলিস্টে মামলাটি এক নম্বরে থাকায় ধারণা করা হচ্ছে ৫ সদস্যের আপিল বিভাগের কার্যক্রম সকাল ৯টায় শুরু হয়েই মাওলানা সাঈদীর ব্যাপারে রায় দেয়া হবে।

এই মামলার রায় পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ করে আবেদন করার কোন সুযোগ না থাকায় আজকের রায়ের মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত হবে মাওলানা সাঈদীকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাসিঁ দেয়া হচ্ছে কিনা।

পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি এস কে (সুরেন্দ্র কুমার) সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক)।

এ বছরের ১৬ এপ্রিল আপিল মামলার শুনানি শেষ হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখার এ আদেশ দেন আপিল বিভাগ।

এর আগে স্বাধীনতার পর পর দায়ের হওয়া বরিশাল বিচারিক আদালতে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলার নথি ও জিআর তলব বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামীপক্ষের পৃথক আবেদন আজ খারিজ করে দেয় আদালত। আদালতের আদেশে তখন বলা হয়,‘বোথ দ্যা পিটিশন আর রিজেক্টেড। জাজমেন্ট সিএভি।’

১৫ এপ্রিল মঙ্গলবার ৪৯ তম দিনে এ আবেদন বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল। মৃত্যুদন্ডের রায়ে আনা আপিল আবেদনের ওপর রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ওই দিন শেষ হয়। গত ১৬ এপ্রিল ছিল এ মামলায় আপিল শুনানি কার্যক্রমের ৫০তম দিন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পর দ্বিতীয় কোন মামলার আপিলের রায় হতে চলেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রেও রায় অপেক্ষামান রাখে আপিল বিভাগ। পরে ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ বাড়িয়ে ফাঁসির রায় দেয়া হয়। এরপর কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ও কার্যকর করা হয়।

সাঈদীর পক্ষে আপিলে শুনানিতে যুক্তিতর্ক পেশ করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহাবুব হোসেন ও এসএম শাহজাহান। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তাকে সহযোগিতা করেন অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল ও ট্রাইব্যুনালের সমন্বয়ক এমকে রহমান, ট্রাইব্যুনালে এ মামলার প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তখন সাংবাদিকদের বলেন, সাঈদীর সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডাদেশের রায় বহাল থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দেয়া সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার পক্ষে আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক সমাপ্ত করে ছিল।

মাহবুবে আলম বলেন,আপিলে আসামীপক্ষ যে সকল যুক্তি পেশ করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ তার জবাব দিয়েছে। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল তার মৃত্যুদন্ড সঠিকভাবেই প্রদান করেছে এবং তা বহাল রাখার জন্য রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি পেশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল যেসকল অভিযোগে তাকে সাজা দেয়নি,সেগুলোতেও যেন তাকে শাস্তি প্রদান করা হয় তারও আর্জি পেশ করা হয়েছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনীত ২০টি অভিযোগের পক্ষে আপিল শুনানিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

অপরদিকে সাঈদীর পক্ষে আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেন আসামী সাঈদী খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। সাঈদী মুক্তিযুদ্ধকালে কোন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন না বলে দাবী করেন তার এ আইনজীবী।

সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের বিষয়ে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আসামীপক্ষে এডভোকেট এএসএম শাহজাহান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর শুরু হয় উভয়পক্ষের যুক্তি খন্ডন পর্ব যা ১৫ এপ্রিল শেষ হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত (২০১৩) বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করেছিল ট্রাইব্যুনাল। এরমধ্যে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং ১২টিতে তাকে খালাস দেয়া হয়।

প্রমাণিত ৮টি অভিযোগ হচ্ছে ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ এবং ১৯। এরমধ্যে ৮ এবং ১০ নং অভিযোগে সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এ দুই মামলার মধ্যে রয়েছে ইব্রাহিম কুট্রি হত্যা ও বিশাবালী হত্যার অভিযোগ। দুইটি অভিযোগে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় প্রমানিত অপর ছয় অভিযোগে সাজা প্রয়োজন নেই বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করে।

সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১’ সালের ৮ মে বেলা ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সহযোগীরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন পসারী এবং ইব্রাহিম কুট্রিকেসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে পাড়েরহাট সেনা ক্যাম্পে নেয়ার পথে সাঈদীর প্ররোচণায় ইব্রাহিম কুট্রিকে হত্যা করে লাশ স্থানীয় একটি ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়া হয়। মফিজ পসারীকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

অভিযোগ-১০ এ বলা হয়েছে, ৭১’ এর ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এসব বাড়ির মালিকেরা হলেন- চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল মন্ডল, বিশাবালী, সুকাবালি, সতিশ বালা প্রমুখ। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিশাবালীকে তার বাড়ীর নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করে।

এ রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ মার্চ সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক দু’টি আপিল দাখিল করে। যে সব অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল সে অভিযোগগুলোতে আপিলে দন্ডের আর্জি জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

ঢাকা, কেএ, ১৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ