নারায়নগঞ্জ পাইকপাড়ার বড় কবরস্থান এলাকার একটি তিনতলা ভবন ঘিরে শনিবার সকালে অভিযান শুরু করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিট। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সোয়াট। সহযোগিতা করে র‌্যাব-১১ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে নয়টার পর ভবনের কাছ থেকে প্রথম গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এরপর থেমে থেমে গোলাগুলি হয়। বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়।

অভিযানসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার রাত আড়াইটার দিকে পাইকপাড়ায় অবস্থান নেন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

সেখানে তিনতলা 'দেওয়ান বাড়ি'র তৃতীয় তলার দুটি ফ্লাটে জঙ্গিদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বাড়িটির আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়।

শনিবার ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার দিকে বাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ। অভিযানের অংশ হিসেবে প্রথমে বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন দেওয়ানসহ বাকি চারটি ইউনিটের ভাড়াটিয়াদের কৌশলে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়া হয়।

এরপর সেখানে পুলিশের স্পেশাল সোয়াট টিম, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় পুলিশ মোতায়েন করে পুলিশের সিটি ইউনিট অভিযান শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে র‌্যাবের অতিরিক্ত সদস্যও মোতায়েন করা হয়।

অভিযানের এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ লাইন্স থেকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে আনা হয়। তারা পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। এলাকার ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়।

মূল অভিযান শুরু হয় সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। পুলিশের সদস্যরা তিনতলার দিকে এগিয়ে গেলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে জঙ্গিরা।

এরপর পুলিশ জঙ্গিদের আত্মসমর্পণে আহ্বান জানায়। কিন্তু তারা তাতে রাজি না হয়ে উল্টো গ্রেনেড ছুড়ে মারে। এরপরই উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় চলতে থাকে।

এরই মধ্যে বাড়িটির পেছন দিক থেকে পুলিশের আরেকটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে সকাল ১০ ৩৫ মিনিটের দিকে অভিযান সম্পন্ন করে। সফল এ অভিযানে তারা স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেন। পরে বাড়িটির ভেতর তিনজনের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন দেওয়ান পুলিশকে জানিয়েছেন, ওষুধ ব্যবসায়ী পরিচয়ে রমজান শেষে তার বাড়ির তৃতীয় তলার দুটি ইউনিট ভাড়া নেন কয়েকজন ব্যক্তি।

ঘণ্টা খানেক পর অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের মহাপরিদর্শক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, অভিযানে নব্য জেএমবির তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে। পুলিশের কাছে তামিম চৌধুরীর যে ছবি রয়েছে, তার সঙ্গে নিহত একজনের চেহারা হুবহু মিলে গেছে।

শহীদুল হক বলেন, ‘এতে স্পষ্ট, তিনি তামিম হবেন।’ তবে, নিহত বাকি দুজনের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ।

অপারেশন হিট স্ট্রং টুয়েন্টি সেভেনে নিহত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী নিউ জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান ছিলেন বলেও জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন বলে বার বার দাবি করে আসছিল পুলিশ।

তাঁকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালাচ্ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি তামিমকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

পাইকপাড়ার স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে তাঁরা বেশ কয়েকটি গাড়ি দেখতে পান। গাড়িতে করে আসা সাদাপোশাকের পুলিশ সদস্যরা এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেন। তাঁরা পাইকপাড়া বড় কবরস্থান এলাকায় অবস্থিত একটি ভবন ঘিরে তৎপরতা শুরু করেন।

অভিযানকালে জেলা পুলিশ ও র‌্যাব পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। এলাকার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে একটি একে-২২, একটি পিস্তল, ও ২-৩ টি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ও গোলাগুলির শব্দে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই রাতে পাঁচ জঙ্গি গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় হামলা চালায়। তারা দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

ওই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের বোমায় নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনা অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের ১২ ঘণ্টার জিম্মি সংকটের অবসান হয়। অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হন।

ওই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কানাডা প্রবাসী তামিমকে দায়ী করে আসছিল পুলিশ। তামিম ২০১৩ সালে কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসে এবং সেই থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করে। পরে তার বিষয়ে নানা তথ্য আসতে শুরু করলে সে আত্মগোপনে চলে যায়।

কেবি