গণপরিবহনে যৌন হয়রানি যেন মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আর ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় নারীযাত্রীদের মনে আতঙ্ক বেড়েছে বহুগুণ। এতে উদ্বিগ্ন অভিভাবক সমাজ।
শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুগামী বাসে ধর্ষণের শিকার হয় প্রতিবন্ধী কিশোরী। বাসচালক, হেলপার ও সুপারভাইজার মিলে তাকে ধর্ষণ করে।
বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক কবিরুল হক শনিবার জানান, প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে অজ্ঞান অবস্থায় শুক্রবার রাতে পুলিশ উদ্ধার করে। তাকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। নাজমুল নামক হেলপারকে গ্রেফতার করার পর ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। চালক ও সুপারভাইজারকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
এর আগেও টাঙ্গাইল মহাসড়কে চার নারী বাসে ধর্ষণের শিকার হয়। গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে যাওয়ার পথে মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপা নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে বাসচালক ও হেলপার।
শুধু বাসে নয়, প্রাইভেটকারে তুলে নিয়েও ঘটছে নির্যাতন, গণধর্ষণ। ২০১৫ সালের মে মাসে রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে এভাবে গণধর্ষণ করা হয়। গত ১০ জুন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়। গত বছরের ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় লেগুনার ভেতর সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ করে লম্পটরা।
চলতি বছরের ২ জুলাই নেত্রকোনার হাওরে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিশুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে গণধর্ষণ করা হয়। এর আগে ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল টাঙ্গাইল যমুনা নদীর চরে নৌকার ভেতর বাবাকে বেঁধে রেখে দুই মেয়েকে গণধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণ যেন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
কোনো যানবাহনই নারী কিংবা কন্যাশিশু, এমনকি প্রতিবন্ধী নারীর জন্যও নিরাপদ নয় জানিয়ে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির যুগান্তরকে জানান, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ঘটনায় অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হলে এ অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ না করতে পারলে কোনো উন্নয়নেরই সুফল আসবে না। সংস্থাটির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীতে গণপরিবহনে ৮৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার।
বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমরা কি অসভ্য জাতিতে পরিণত হচ্ছি? একজন প্রতিবন্ধী নারী-কন্যাশিশু পর্যন্ত ধর্ষণ, গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে ইমারত নির্মাণের মধ্য দিয়ে, কিন্তু মানুষগুলোর কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না।
গণধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধে মাত্র ২ শতাংশ বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাকি ৯৮ শতাংশ অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ১৫ মাসে সারা দেশে গণপরিবহনে ১২১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সভানেত্রী আয়শা খানম বলেন, নারীরা কোনো গণপরিবহনেই আজ নিরাপদ নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির মূল কারণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রধান ড. মনিরুল ইসলাম খান জানান, সমাজ ভেঙে যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে মায়া মমতা নেই। একে অপরের মঙ্গল চায় না। নারীর প্রতি সম্মান না দেখালে এমনটা চলতেই থাকবে। পারিবারে নারী ও শিশুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা শেখাতে হবে। নইলে সমাজে ধর্ষণের মতো বর্বরতা বেড়েই চলবে। সূত্র: যুগান্তর।
এসএম





