রাজধানীর কলাবাগানে জোড়া খুনের ঘটনায় জড়িতদের দু'জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ দাবি করেন এবং শিগগিরই এদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে এই দুজনের নাম-পরিচয় এবং তারা কোনো সাংগঠনের সদস্য কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কিছু বলেনি।
গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আলামত পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার এ-ও বলেছেন যে জুলহাজ ও মাহবুব জঙ্গিদের হাতে, নাকি আর্থিক কোনো ব্যাপারে খুন হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে তিনটি গাড়ি হস্তান্তর উপলক্ষে ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও পুলিশের পক্ষে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো রোধ করা সম্ভব নয়। এসব হত্যাকাণ্ড তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
গত সোমবার কলাবাগানের উত্তর ধানমন্ডির ৩৫ নম্বর বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুবকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। জুলহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডিতে চাকরি করতেন। আর তাঁর বন্ধু মাহবুব একজন নাট্যকর্মী।
হামলার সময় বাধা দেওয়ায় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী পারভেজ মোল্লাকেও কোপায় দুর্বৃত্তরা। পরে কলাবাগানের ডলফিন গলি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে তারা। এ সময় পুলিশের এক সদস্য মুমতাজ উদ্দিন দুর্বৃত্তদের একজনকে জাপটে ধরেন। তখন দুর্বৃত্তদের আরেকজন মুমতাজকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে সহযোগীকে ছাড়িয়ে নেয়। কয়েক মুহূর্তের এই ধস্তাধস্তির সময় খুনিদের একজনের একটি মুঠোফোন ও একটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় পুলিশ। মুঠোফোন ছাড়াও ব্যাগে আগ্নেয়াস্ত্রসহ নয় ধরনের আলামত পাওয়া যায়।
এরপর রাতেই কলাবাগান থানায় দুটি মামলা হয়। গতকাল মামলা দুটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে ডিএমপির গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানিয়েছেন।
খুনিরা আদাবরে বাসা ভাড়া করে দুই মাস প্রস্তুতি নেয় । জুলহাজকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে তারা।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দুই মাস সময় নেয় খুনিরা। তারা রাজধানীর আদাবর এলাকায় একটি বাসা ভাড়া করে প্রস্তুতি নেয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাসাটি ছেড়ে দেয় তারা। তারা জুলহাজকে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রতিদিন দুজন করে পালাক্রমে কলাবাগানের ওই এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। এতে তারা নিশ্চিত হয় নিহত জুলহাজ মান্নান কখন বাসায় ফেরেন এবং কে কে বাসায় থাকেন। ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত এবং ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ এসব তথ্য পেয়েছে। তবে পুলিশ এখনো নিশ্চিত নয়, হত্যাকাণ্ডে মোট কতজন অংশ নিয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা ‘আনসার আল ইসলাম’-এর দায় স্বীকার সম্পর্কে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এ ধরনের যত ঘটনা ঘটে, তার দু-এক ঘণ্টার মধ্যে বিদেশ থেকে এ নিয়ে দায় স্বীকারের কথা বলা হয়। এর যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা কতটুকু আছে, তা ভেবে দেখা দরকার। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গতকাল সকালে জুলহাজের বাসার মূল ফটক তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ফটকের সামনে পুলিশের পাহারা ছিল। দুপুরে এই বাড়ির সামনে কথা হয় বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী পারভেজ মোল্লার সঙ্গে। তিনি হত্যাকাণ্ডে সাতজনের সম্পৃক্ত থাকার কথা জানান। পারভেজ বলেন, ঘটনার সময় চার যুবক তিনটি বাক্স নিয়ে আসে। ফটকে কড়া নেড়ে তারা জানায়, জুলহাজের নামে পার্সেল আছে। তখন পারভেজ ফটকের সিটকিনি লাগিয়ে দোতলায় যান পার্সেলের বিষয়টি জানাতে। পারভেজ বলেন, তাঁর সঙ্গে ওই চারজনও ওপরে উঠে যায়। এ সময় জুলহাজ দরজা খুললে ঘাতকদের একজন জানায়, তাঁর (জুলহাজের) নামে পার্সেল আছে। জুলহাজ বলেন, তাঁর নামে কোনো পার্সেল আসার কথা নয়। পার্সেল এলেও পার্সেলে কী আছে, সেটা দেখবেন, তারপর পার্সেল গ্রহণ করবেন।
পারভেজ বলেন, ‘এ সময় তারা জোর করে বাসায় ঢুকতে চাইলে আমি তাদের বাধা দিতে যাই। স্যারও দরজা আটকে দিতে চান। হঠাৎ চারজনের একজন আমার হাতে কোপ দেয়। তারপরও আমি বাধা দিতে গেলে আমার কপালে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। এরপর চিৎকার করে আমি নিচে নেমে আসি। এসে দেখি, বাড়ির আরেক দারোয়ান সুমন ও তত্ত্বাবধায়ক রিপনকে বাসার ফটকের পাশের ছোট একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। আর ফটকের সামনে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ের মধ্যেই দোতলার চারজন জুলহাজের কক্ষে ঢুকে জুলহাজ ও তনয়কে কুপিয়ে চলে যায়। দুর্বৃত্তরা চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় নেয়।’
এইচ ই





