আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আন্তর্জাতিক সম্পাদক, সুপ্রিম কোর্টের জামে মসজিদের খতিব ও উপস্থাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রসেনা।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের (মতিন) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুকী একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। ফারুকী ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস ও ইসলামিক মিডিয়া জনকল্যাণ সংস্থা নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ছাড়াও মেঘনা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবসায়ী অংশীদার ছিলেন তিনি। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি হজে লোক পাঠাতেন।
এদিকে ফারুকী হত্যাকাণ্ডের পেছনে সম্ভাব্য চারটি কারণ সন্দেহ করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ফারুকীর ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে বিরোধিতা, পারিবারিক সমস্যা, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, হজে লোক পাঠানো নিয়ে বিরোধিতার জের ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ফারুকী ব্যক্তিগত জীবনে তিন বিয়ে করেছেন। এ ছাড়া তিনি একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও মালিক। এ ছাড়া প্রতিবছর তিনি হজে লোক পাঠাতেন। এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।
তবে তাঁর স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনেরা দাবি করেন, তাঁর ধর্মীয় মতাদর্শের প্রচার-প্রচারণা ও মাজারবিরোধীরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
নূরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার প্রতিবাদে গতকাল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মদুনাঘাটে সড়ক আবরোধ করেন তাঁরা l
বুধবার রাত আটটার দিকে দুর্বৃত্তরা পূর্ব রাজাবাজারের দোতলার ভাড়া বাসায় ঢুকে স্ত্রী ও স্বজনদের আটকে রেখে তাঁদের সামনে ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করে। বুধবার দিবাগত রাত সোয়া দুইটার দিকে ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আট-নয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ফারুকীকে খুন করে বাসা থেকে ছয় লাখ তিন হাজার টাকা লুট হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়। শেরেবাংলা নগর থানার পাশাপাশি মামলাটি ছায়া তদন্ত করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাব।
মামলার বিবরণে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে পূর্ব রাজাবাজারে ফারুকীর বাসায় কলিংবেল বাজিয়ে দুই ব্যক্তি হজে যাওয়ার জন্য কথা বলতে এসেছে বলে জানায়। দরজা খুলে তাদের বসার ঘরে বসানো হয়। এ সময় তারা ফারুকীকে বলে, তাদের বড় ভাইয়েরা হজে যাওয়ার জন্য এসে কথা বলবে। যানজটে আটকে আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসবে। এর ২০ মিনিট পর ছয়-সাতজন লোক ঢোকে। একপর্যায়ে ফারুকী তাঁর ভাগনে মারুফ হাসানকে একটি চেয়ার আনতে বলেন। চেয়ার আনার পর মারুফ দেখতে পান, ওই ব্যক্তিরা ফারুকীর মাথায় পিস্তল ও চাপাতি ধরে আছে। এ সময় তারা মারুফের দুই হাত ও মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর তারা ফারুকীর দ্বিতীয় স্ত্রী লুবনা ইসলামের ঘরে ঢুকে তাঁকে, তাঁর মা, গৃহকর্মী ও ফারুকীর দুই নারী ভক্তকে বেঁধে ফেলে। রাত আটটার পর লুবনা কোনোভাবে বাঁধন খুলে এসে দেখেন ফারুকীর গলা কাটা, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। লুবনা চিৎকার দিলে আসামিরা বাসা থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকাসহ ছয় লাখ ৩০ হাজার টাকার গয়না ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী নিয়ে যায়। আসামিদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের পরনে ফুলপ্যান্ট, শার্ট বা গেঞ্জি ছিল।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, খুনিদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। বুধবার রাতে দুর্বৃত্তরা ফারুকীর বাসায় অবস্থানকালে ময়মনসিংহ থেকে মাওলানা শফিকউল্লাহসহ তিন ব্যক্তি ডিসেম্বরে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠেয় ওয়াজ মাহফিলের চুক্তি করতে এসেছিলেন। ঘটনার বিষয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার জানান, হারুনী ও তারেককে সন্দেহভাজন তালিকায় রাখা হয়েছে।
আহলে সুন্নাতের কর্মী মুফতি নজরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের জন্য আহলে হাদিস, হিযবুত তাহ্রীর ও জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেন।
নিন্দা: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ফারুকী হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল পৃথক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান ও হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী এ প্রতিবাদ জানান। এ ছাড়া আরও বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), ছুন্নী আন্দোলন বাংলাদেশ।
ঢাকা, ২৯ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ





