দিনব্যাপি নানা গুঞ্জনের পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৫মিনিটে কার্যকর হয়েছে।
এবং তার প্রায় ২ঘন্টা পরে রাত ২টা ৫১মিনিটে সাকা-মুজাহিদের মরদেহবাহী এ্যম্বুলেন্স চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরের দিকে রওনা হয়।
এর প্রায় ৪ঘন্টা পর মুজাহিদের মরদেহ রোববার সকাল ৬টায় কঠোর নিরাপত্তায় ফরিদপুরে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে।
এবং ৭টায় ফরিদপুরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকার আইডিয়াল ক্যাডেট মাদ্রাসা গেটের পাশে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয় মুজাহিদকে।
জানাজা পড়ান তার বড় ভাই আলী আফজাল মোহাম্মদ খালেফ। তবে নিরাপত্তার খাতিরে নিকটাত্মীয় ছাড়া জানাজায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি স্থানীয়দের।
অপরদিকে, রোববার সকাল ৯টায় সাকার লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রামের রাউজানে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে।
এবং সকাল ৯টা ৪০মিনিটে রাউজানের গহিরায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাকা চৌধুরীর প্রয়াত ভাই সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে, শনিবার দুপুরে কারাগার থেকে জানানো হয় যে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহম্মাদ মুজাহিদ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। আর এ আবেদন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মাদ আব্দুল হামিদ নাকোচ করে দেন।
অপরদিকে, সাকা-মুজাহিদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি। তারপর রাতেই তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পরপরেই তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় শাহবাগে অবস্থানরত গণজাগরণমঞ্চের মুখপাত্র বলেন, এই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় দেশ ও জাতীর আশা পূর্ণ হয়েছে। সেই সাথে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।
জামায়াতের পক্ষথেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মুজাহিদকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। এবং এর প্রতিবাদে সোমবার সারাদেশে হরতালের ডাক দিয়েছে দলটি।
কিন্তু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দল বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি।
সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা। সেই সাথে তারমিষ্টিও বিতরণ করেছে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক ও শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনি আপিল করলে চলতি বছরের ১৬ জুন চূড়ান্ত রায়েও ওই সাজা বহাল থাকে।
আর সালাউদ্দিন কাদেরের রায় এসেছিল ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় এ বছর ২৯ জুলাই আপিলের রায়েও বহাল থাকে।
তাদের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় একই দিনে, ৩০ সেপ্টেম্বর। এরপর নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল দুজনের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে এবং কারা কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবর তা দুই ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনায়।
এরপর সাকা-মুজাহিদ ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত বুধবার (১৮ নভেম্বর) আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়।
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আপিল বেঞ্চের অন্য তিন বিচারকের দেওয়া দুই রায়েই বলা হয়, আপিল শুনানির পর দেওয়া রায়ে কোনো ত্রুটি বিচারকদের নজরে আসেনি। সুতরাং দণ্ড পুনর্বিবেচনার কোনো কারণও তারা খুঁজে পাননি।
এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের এ দুই মামলার সব আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি হয়।
এর আগে, ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে।
এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল ফাঁসিতে ঝোলানো হয় জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে।
এই দুই যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি বলে সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চিকন আলী নামে এক দালালের ফাঁসির রায় হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের দায়ে, তবে জেনারেল জিয়ার আমলে তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যান।
এআই/এমকে





