গত ২০ ফেব্রুয়ারি সোমবার বেলা ২টার দিকে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের তিনতলা ভবনের দোতলার সাধারণ শাখার কক্ষে ব্যাপক ভিড়। চোখ পড়তেই দেখা গেল যুবলীগ নেতাদের কেউ চেয়ারে বসে, আবার কেউ গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

এমন সময় জনৈক সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তির আগমন ঘটলো সেখানে। তার আগমনের কারণ জানতে চাইলেন যুবলীগ নেতাকর্মী ও ক্যাডাররা।

তিনি জানান, এসেছেন হাট-বাজার ইজারার দরপত্র কিনতে। তাকে দরপত্র কিনতে নিষেধ করলেন যুবলীগ কর্মী হান্নান। হান্নান ওই ব্যক্তিকে শহর আওয়ামী লীগের এক নেতার নাম বলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

কোনো হুমকি-ধামকি না শুনে ঠিকাদার সোনা দরপত্র কিনতে গেলে সদর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক আবু তৈয়ব বাদশাকে মোবাইলে ধরিয়ে দেন দলীয় কর্মী হান্নান।

অপর প্রান্ত থেকে বাদশা ঠিকাদারকে দরপত্র কিনতে নিষেধ করেন। এভাবেই জেলা প্রশাসনের দফতরে পাহারা বসিয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন যুবলীগ নেতাকর্মী ও তাদের সহযোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা ও মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়সহ যে সকল দফতরে হাটবাজার ইজারার সিডিউল বিক্রি হচ্ছে সব স্থানে একই চিত্র। সবই দখল করে রেখেছে যুবলীগ নেতাকর্মীরা।

দরপত্র কিনতে আসা সোনা জানান, এটা অন্যায়। জেলা প্রশাসনের কক্ষেই যদি এমন আচরণ করা হয় তাহলে আমরা নিরাপদ কোথায়?

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের সরকারি হাট-বাজার সমূহের ব্যবস্থাপনা ও ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী কুষ্টিয়া সদর ও মিরপুর উপজেলার অধীনে হাট-বাজার ইজারার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

সদর উপজেলায় ১২টি লটে ২৯টি হাট-বাজার ও মিরপুর উপজেলায় ১১টি লটে ৩২টি হাট-বাজার আগামী এক বছরের জন্য ইজারা প্রদান করা হবে। গতকাল বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছিল দরপত্র কেনার শেষ সময়।

শেষ দিন বুধবার সকালে আবারও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালেক্টরেট ভবনের সামনে মোটরসাইকেলের নিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন যুবলীগ নেতা বসে পাহারা দিচ্ছেন।

সোমবারের মতো একই ধরনের ভিড় সাধারণ শাখায়। এখানেও সেই যুবলীগ নেতাকর্মীরা। অফিস সহকারী মামুনের টেবিলের সামনে বসে আছেন কুষ্টিয়া সদরের যুবলীগ নেতা হান্নান।

যুবলীগ নেতা হান্নান চেয়ারে বসে নির্ধারণ করছেন কারা দরপত্র কিনতে পারবেন আর কারা পারবেন না। এদিকে সোমবার সাধারণ শাখার সামনে পুলিশ না দেখা গেলেও বুধবার পুলিশ পাহারা ছিলো।

এদিকে, সকাল থেকেই মিরপুর উপজেলার দরপত্র নেয়ার জন্য সাধারণ শাখায় অবস্থান করছেন আকরামসহ কয়েকজন।

অফিস থেকে তাদের জানানো হয়েছে, দরপত্র শেষ। এর মধ্যে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে গেলেন অনেকেই। দুপুর ৩টার সময় জেলা প্রশাসক জহির রায়হান উপস্থিত হন সাধারণ শাখা কক্ষে। দরপত্র নেই শুনে ফোন করেন মিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে।

ফোনে কথা শেষ করে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দরপত্র নিয়ে কুষ্টিয়ায় পিওন রওয়ানা হয়েছেন। শেষ সময় ৪টার দিকে মিরপুর নির্বাহী কর্মকর্তা অফিসের পিওন ১০টি দরপত্র নিয়ে আসেন।

সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করা আকরাম বেলা সাড়ে ৪টার দিকে দরপত্র হাতে পান। দরপত্র নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুবলীগ নেতাকর্মী ও ক্যাডাররা তার পিছু নেন।

তিনি জানান, সদর ও মিরপুরের পৃথক পাঁচটি স্থানে দরপত্র বিক্রি হয় সোমবার। কিন্তু শেষদিন বুধবার সকাল থেকেই বলা হয় দরপত্র শেষ। আসলে প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব অন্যায় করছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

এরপর জেলা প্রশাসক চলে যেতেই আবারও একই চিত্র দেখা যায়। সাধারণ শাখার ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর উপজেলা যুবলীগের ৭-৮ জন ক্যাডার কক্ষে অবস্থান করছেন। তারা মিরপুর থেকে আসা দশটি দরপত্র ক্রয় করতে এসেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দরপত্র কিনতে আসা একাধিক ব্যক্তি জানান, সকাল থেকে শেষ সময় পর্যন্ত কুষ্টিয়া সদর ও মিরপুর উপজেলার হাট-বাজার ইজারার দরপত্র কিনতে পারেননি সাধারণ ঠিকাদাররা। ক্ষমতাশীন দলের নেতাদের পছন্দের লোক ছাড়া কাউকে দরপত্র ক্রয় করতে দেননি স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মী ও ক্যাডাররা।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক জহির রায়হান বলেন, বুধবার দরপত্র বিক্রি শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে দরপত্র জমা দিতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে যদি অনিয়ম হয় তাহলে পুনরায় টেন্ডার ডাকা হবে।

এমএনজে