২০০৯ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে বার বার আলোচনায় উঠে আসেন ইসলামী ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মাদ আফজাল।

সাম্প্রতি ডিজি সামীম মো. আফজালের বিরুদ্ধে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের ৩৮ কর্মকর্তাকে মৌখিক নির্দেশে সরকারি চাকরিতে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ফিল্ড অফিসার পদে অতিরিক্ত নিয়োগ, প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল করে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তার এ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক এ এম এম সিরাজুল ইসলামের যোগসাজশও রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

আগে জজ ছিলেন ডিজি সামীম মোঃ আফজাল। মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম, ইমাম প্রশিক্ষণ ও তাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ইসলামের মর্মবাণী শিক্ষা দেয়া, বাংলা ভাষায় পুস্তক রচনা ও প্রকাশ, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাসহ নানা মহতী উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি ফাউন্ডেশনের সূচনালগ্ন থেকেই।

তার ধারাবাহিকতায় ইফার মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের শিক্ষার্থী, ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অভিভাবকদের নিয়ে ২০১০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ইফার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ফাউন্ডেশন ভবনের অনুষ্ঠান করা হয়।

এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। এ সময় কাঙ্গালিনী সুফিয়ার সঙ্গে করমর্দনও করেন ডিজি। কাঙ্গালিনী সুফিয়ার একতারা এবং শরীর দুলিয়ে নাচ-গানে বিব্রত অবস্থায় পড়েন উপস্থিত ইমামরা।

এছাড়া একই বছর ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ইফার ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে জাতীয় শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে হামদ ও নাতের বিচারক হিসেবে আঁখি আলমগীরসহ এমন শিল্পীদের আনা হয় যাদের অনেকেই ইসলামী সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত নন। এ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনেকে প্রশ্ন তুললেও ডিজি তাতে কোন পাত্তা দেননি।

একই বছর ২৭ নভেম্বর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের সম্মানে আয়োজন করা হয় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। একপর্যায়ে ডিজির অনুরোধে ইমামদের সামনে মার্কিন তরুণ-তরুণীরা পরিবেশন করে অশ্লীল ব্যালে নৃত্য।

অবশ্য ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, ব্যালে ড্যান্স নয় ৩৫ সেকেন্ডের ‘সুয়িং ড্যান্স’ পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে আগত মার্কিন তরুণীদের সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করেন ইফা ডিজি।

ডিজির এসব কর্মকান্ডের কারণে ২০১১ সালের ৭ আগষ্ট ইফার মসজিদ মিশনের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন ডা. শাহাদাত হোসেন।

ঐ সময় ডা. শাহাদাত হোসেন রেডিও তেহরানকে বলেছিলেন, 'ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মার্কিন তরুণ-তরুণীর ব্যালে নৃত্য প্রদর্শনের প্রতিবাদ করায় দীর্ঘদিন ধরে মহাপরিচালকের সাথে তার মতবিরোধ চলছিল। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সরকারের তদন্ত কমিটির তৎপরতার কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ডা.সাহাদাত হোসেন হতাশ হয়ে পড়েন।'

দুদকের একটি সূত্র মতে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনন্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়ন্ত্রিত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসিজদে পেশ ইমাম নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং জালিয়াতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ওই পেশ ইমাম পদে নিয়োগে দ্বিতীয় শ্রেণীর পদের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা, প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে আট বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।

আর দ্বিতীয় শ্রেণীর পদের বেতন স্কেল ধরা হয় ১৮,৫০০-২৯,৭০০ টাকা। এছাড়া প্রার্থীর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয় ৪০ বছরের জায়গায় অনূর্ধ্ব-৩০ বছর।

শুধু তাই নয়, দুইজন পেশ ইমামের নিয়োগপত্রে প্রথম শ্রেণী এবং সিনিয়র সহকারী সচিব পদ মর্যাদার স্কেল দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষার সময় বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে বায়তুল মোকাররমের খতিব প্রফেসর মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ড. আবদুল্লাহ আল মারূফ এবং মূল সদস্য ইফার সচিব রেজাউল করিমসহ সংস্থার ১নং সিলেকশন কমিটির ১৪ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তারা উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সিদ্ধান্ত দেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মো. আফজাল ৮ বছরের চাকরির ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদপত্র দাখিল করে ওই দুই ইমামের মধ্যে তার এক ভাগ্নেকে নিয়োগ দেন। অপরজন অবশ্য ঢাকার এক এমপির ঘনিষ্ঠ জন বলে জানা যায়। ডিজির ভাগ্নে মাওলানা এহসানুল হক বায়তুল মোকাররম মসজিদে যোগদান করেন। তিনি ২০০৫ সালে ঢাকার মালিবাগ জামেয়া শরিয়া মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস এবং ২০০৬ সালে ইফতা সম্পন্ন করেছেন।

অপরদিকে চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে মাওলানা আনোয়ারুল হক পেশ ইমাম হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ২০০১ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। তিনি ২০০৬ সালে মিসর থেকে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু ইমামতির অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রশ্ন রয়েছে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, গত ৩ বছর ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি বিস্তার অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ১৮ মাসে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ পর্যন্ত ওঠে।

এ বিষয়ে খোদ ধর্ম মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত টিম গঠন করে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় তার দুর্নীতির তদন্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ওই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ তদন্ত শুরু করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই টিমের কার্যক্রম থেমে গেছে।

দীর্ঘ দিন পর আবারো অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মঙ্গলবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে:

মৌখিক নির্দেশে সরকারি চাকরি

অভিযোগে বলা হয়, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পে নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কাজ করছেন ৩৮ কর্মকর্তা। মৌখিক নির্দেশে ব্যবহার করছেন প্রকল্পের মোটরবাইক। তাদের স্বাক্ষরেই ব্যাংক থেকে তোলা হচ্ছে প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজালের মৌখিক নির্দেশে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে সরকারি কোনো নিয়োগপত্র ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন ১২ ফিল্ড অফিসার, ২৩ ফিল্ড সুপারভাইজার ও তিন মাস্টার ট্রেইনার। ২০১১ সালের জুন থেকে দায়িত্ব পালন করছেন তারা।

একজন ফিল্ড অফিসার মাসে সরকারি বেতন পান ১৪ হাজার ১০০ টাকা। ব্যবহার করেন সরকারি মোটরবাইক। এ জন্য প্রতি মাসে সরকারিভাবে ২৫ থেকে ৩০ লিটার জ্বালানি তেল পান। সবকিছু মিলিয়ে একজন ফিল্ড অফিসার মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা পান। অন্যদিকে ফিল্ড সুপারভাইজার ও মাস্টার ট্রেইনার পদে সরকারি বেতন ১০ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যান্য সুবিধাসহ মাসে ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন তারা। এ হিসেবে মৌখিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের পেছনে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অর্থ আত্মসাৎ

গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ভাতা হিসেবে প্রকল্পে রাখা সোয়া কোটি টাকা শিক্ষকদের না দিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। দাওয়াতি মাহফিল নামক অনুষ্ঠানের নামে এ টাকা খরচ দেখানো হচ্ছে। এ মাহফিলে শিক্ষকদের নিজ খরচে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।

প্রকল্পে ভুয়া কেন্দ্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ

প্রকল্পে ভুয়া কেন্দ্র দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঢাকা শহরে দুই হাজার ও চট্টগ্রাম শহরে দেড় হাজার কেন্দ্র রয়েছে কাগজে-কলমে। ঢাকার দুই হাজার কেন্দ্রের মধ্যে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ৪০টি, দক্ষিণ গেটে ২০টি ও কমলাপুর রেলস্টেশনে ১০টি কেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে। এভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মাসে ৭০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে কমিশন থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে নথিপত্র চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. জুলফিকার আলী এ নোটিশ করেছেন। নোটিশে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চাহিদা অনুসারে নথিপত্র সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার, অনুমোদিত ডিপিপি, আইএমইডি কর্তৃক প্রজেক্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রকল্পে নিয়োজিত ১২ জন ফিল্ড অফিসার, ২৩ জন ফিল্ড সুপারভাইজর ও তিন জন মাস্টার ট্রেইনার নিয়োগ সংক্রান্ত নথি ও নোটশিট।

ওই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির বিলের কপি, প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণভাতা খাতে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত বরাদ্দকৃত বাজেট ও বিল ভাউচার, বর্ধিত খাতসমূহের খরচের হিসাব বিবরণীর সত্যায়িত ছায়ালিপি দুদকে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে বর্ধিত প্রকল্পের কেন্দ্রসমূহের পূর্ণ ঠিকানা ও প্রকল্প পরিচালকসহ ওই সব কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম-ঠিকানা, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের সভার নোটিশ, রেজুলেশন ও অনুমোদন সংশ্লিষ্ট যাবতীয় রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ছায়ালিপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত ছায়ালিপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৯২ সাল থেকে সারাদেশে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রকল্পটির এখন পঞ্চম ধাপ শেষ হয়েছে। ৬৪৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পে সারাদেশের ৪৩ হাজার মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন কর্মরত আছেন। প্রায় ১২ লাখ শিশু লেখাপড়া করছে এ প্রকল্পের অধীন।

বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজাল এক অনলাইন নিউজ পোর্টালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে (দুর্নীতির অভিযোগ) আমি কিছুই জানি না। গণশিক্ষার প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন। আমি তো আর গণশিক্ষা দেখি না। এটা হল একটা প্রজেক্ট। এ বিষয়ে প্রজেক্ট ডিরেক্টর সব বলতে পারবেন। আমি কিছু জানি না।’

এআই, কেবি