রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীণ বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানী কার্যক্রম থেমে গেছে। আর এ বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের লুকোচুরি চলছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। তবে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং কর্মকর্তাদের ব্যাক্তিগত দুর্নীতি অনুসন্ধান চলছে বলে জানা যায়।

নাম না প্রকাশের শর্তে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান,গত ফেব্রুয়ারি মাসে রহস্যজনক কারণে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে দুদকের বন্ধ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে অনুসন্ধানী কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি প্রতিবেদন নিয়ে পুরো বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং দু-একজন কর্মকর্তার ব্যাক্তিগত দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান আছে।

অনুসন্ধাণী কর্মকতাদের দেয়া চিঠিতে বেসিক ব্যাংকের গ্রাহকদের নাম-ঠিকানার তালিকা, ঋণ সহায়তা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান প্রোফাইল, ঋণের পরিমাণ, জামানতের পরিমাণ, মূলধন স্থিতি, বর্তমান অবস্থা, অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্ট, ইত্যাদি বিষয় জানতে চাওয়া হয়।

এদিকে বেসিক ব্যাংক চিঠির জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে বলে জানা যায়। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক লি: একটি সমঝোতার অজুহাতে দুদক ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন নেই’ উল্লেখ করে অনুসন্ধান নথিটি ক্লোজ করে দেয় হয়, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের অর্থ লুটের ঘটনা ছিলো হলমার্কের চেয়েও ভয়াবহ। হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির ক্ষেত্রে সোনালি ব্যাংকের মধ্যম স্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিলো। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত গুলশান, দিলকুশা, শান্তিনগর এ ৩টি শাখায় এমন সব ঋণ সহায়তা দেয়া হয়েছে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। ঋণ গ্রহিতার নাম ভুয়া, প্রতিষ্ঠানও ভুয়া। জমির জাল দলিল বন্ধক রেখে দেয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা ঋণ। কাগজপত্রের সত্যাসত্য যাচাই না করেই ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদ ঋণ প্রদানের সুপারিশ করেছেন।

জানা যায়, পরিচালনা পরর্ষদ সদস্যরাই আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে কোম্পানির নাম করে বেসিক ব্যাংক থেকে অর্থ সহায়তা নিয়েছেন। আইবিপি (ইনল্যান্ড বিল পেমেন্ট), পিএডি (পেমেন্ট এগেনস্ট ডকুমেন্ট), এফবিপি (ফরেন বিল পার্চেজ) পিএসসি (প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট) -চার ধরণের পদ্ধতিতে বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাট করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৬ মে বেসিক ব্যাংকটির গুলশান, দিলকুশা, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন শাখায় ঋণ বিতরণে অনিয়ম প্রতিরোধের ব্যর্থতার অভিযোগে ওই ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে ।

গত ২৯ মে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু গত শুক্রবার ৪ জুলাই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সরকারি বাসভবনে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

জানা যায়, বর্তমানে ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে কে অনুসন্ধান করছেন, এ প্রশ্নের সঠিক জবাব নেই দুদকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে। গত ২৫ জুন দুদক সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী বলেন, বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যায়নি। অনুসন্ধান চলমান আছে। তবে কে অনুসন্ধান করছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার মনে নেই।

জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্যরে সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুরো বিষয়টি জেনে নেয়ার পরামর্শ দেন দুদক সচিব।

এর পর থেকে গত ৩ জুলাই পর্যন্ত একাধিকবার সরাসরি জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্যরে সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। দুদকের কোনো কর্মকর্তা বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন, তার নাম জানাতে পারেননি তিনি।

জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য প্রথম দায়িত্ব দেয়া হয় সহকারি পরিচালক মাহবুবুল আলমকে। তিনি এ অভিযোগের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। এরপর অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি টিমকে।

কিন্ত পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বাধীন টিমের উপর আলোচিত হলমার্ক গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধানের দায়িত্ব পড়ে যায় । ফলে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে। আর সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে সহকারি পরিচালক মাহবুবুল আলম, আশিকুর রহমান, উপ-সহকারি পরিচালক নাসিরউদ্দিন অনুসন্ধান শুরু করেন। তারা বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য ইশরায় থেমে যায় তাদের অনুসন্ধানী কার্যক্রম। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে,তারা কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ঢাকা, একে, ৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ