একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ (একেএম) ইউসুফের মামলায় সব ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ইউসুফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষকে চুক্তি উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন,আগামী ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তি উপস্থাপন করবে।
বুধবার চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
মাওলানা একেএম ইউসুফের পক্ষে একমাত্র সাফাই সাক্ষী তার ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমানের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা করা হয়।
মাওলানা ইউসুফের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন,আজ এ মামলার সব ধরণের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলার ১৩টি অভিযোগের বিরুদ্ধে আমাদের কমপক্ষে ১৩ জন সাক্ষী প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন,মামলার অভিযোগ বাগেরহাটের চারটি থানা এলাকার ঘটনা। এই হিসেবেও অন্তত প্রতি থানায় একজন করে সাক্ষী প্রয়োজন ছিল। সেই সুযোগ না থাকায় আমরা একজন দালিলিক সাক্ষীর সাক্ষ্য দিয়েছি।
মিজানুল ইসলাম বলেন,আমরা আদালতে মামলার নথি দিয়ে দেখিয়েছি মজিদ হত্যা মামলায় ১৯৭২ সালে বিচার করা হয়েছে। সেখানে একেএম ইউসুফকে আসামী করা হয়নি। আর ১৯৭৩ সালে আসামীর বিরুদ্ধে হত্যা,ধর্ষণ,অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ না থাকায় সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মুক্ত হন। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ,রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন,এই মামলায় আমরা ২৭ জন সাক্ষী দিয়েছি। আর আসামীপক্ষ একজন সাক্ষী দিয়েছে। সাক্ষী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আসামী রাজাকার ও শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন,আমরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শুরু করব। এরপর আসামীপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করবে। এর মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম শেষ হবে।
আসামীপক্ষের সাক্ষী প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট হায়দার আলী বলেন,এই সাক্ষী দিয়ে আসামীপক্ষের কোন লাভ হয়নি।
অপর দিকে আসামীপক্ষের একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মাওলানা ইউসুফের বড় ছেলে একেএম মাহবুবুর রহমান।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন,১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১১ বা ১২ বছর। ’৭১ সালে আমরা খুলনা শহরের বাসায় স্বপরীবারে অবস্থান করি। ’৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার পিতা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলে আমরা ঢাকায় চলে আসি। আমার পিতা ও আমরা পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মিন্টু রোডে একই সঙ্গে বসবাস করতাম।
তিনি বলেন,৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মালেক মন্ত্রী সভার পদত্যাগের পর রেডক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিডেন্টালে আমার পিতাসহ আমরা পরিবারের সবাই আশ্রয় গ্রহণ করি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের চার বা পাঁচ দিন পরে রেডক্রস কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এরপর আমরা এক থেকে দেড়মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমার পিতাসহ স্বপরিবারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে ছিলাম।
একপর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী মালেক মন্ত্রী সভার আটককৃত সদস্যদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের কারাগারে প্রেরণ করে। আমরা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তখন খুলনার বাড়িতে ফিরে যাই।
তিনি বলেন,১৯৭২ সালে আমার পিতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু যেহেতু আমার পিতার বিরুদ্ধে হত্যা,ধর্ষণ,অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ ছিল না সেজন্য ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় আমার পিতাকে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে মুক্তি দেয়া হয়।
মাহবুবুর রহমান বলেন,আমার পিতা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন সত্য কিন্তু কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ২০০৯ সাল থেকে আমার পিতার বিরুদ্ধে কিছু মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তার একটি হল এই মামলার সাক্ষী লিয়াকত আলী খান কর্তৃক দায়েরকৃত মোড়লগঞ্জ থানার মামলা নং ২২ (৫) ২০০৯।
তিনি বলেন,আমার পিতার বিরুদ্ধে দালাল আইন ১৯৭২ এর অধীনে একটি মামলা হয়। এই মামলায় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৩ তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। উক্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আমার পিতা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেছিলেন।
তিনি বলেন,এই মামলায় কয়েকটি ঘটনা সংক্রান্ত যথাক্রমে বাগেরহাট,মোড়লগঞ্জ ও কচুয়া থানায় দায়ের করা হয়েছিল। সেখানে আসামী হিসেবে আমার পিতার নাম ছিল না। এই সেই মামলার এজাহারের ফটোকপি। সেগুলো হলো মোড়লগঞ্জ থানার মামলা নং ১৫ (২) ১৯৭২। বাগেরহাট থানার মামলা নং ১৫ (৭) ২০০৯ এবং কচুয়া থানার মামলা নং ৬ (৫) ২০০৯। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার পিতা কখনোই বাগেরহাট মহাকুমার কোন এলাকায় সফর করেননি বা জাননি।
সাক্ষী বলেন,আমার বাবা মন্ত্রী থাকাকালীন যখন যেখানেই গিয়েছেন সরকারি প্রোটকল নিয়ে গেছেন। আমার পিতার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সাক্ষ্য শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী।
জেরায় সাক্ষী মাহবুব বলেন,আমরা আট ভাইবোন। আমার বড় এক বোন আছে এবং তিনি জীবিত আছেন। ১৯৭১ সালে আমার পিতা যখন ঢাকায় আসেন তখন ঢাকার কোন স্কুলে ভর্তি হাইনি। ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের তারিখ ও সময় আমার মনে নেই।
তিনি বলেন,আমি শুনেছি ওই নির্বাচনে আমার পিতা অংশগ্রহণ করেছিলেন। উপ-নির্বাচনে বাগেরহাট ও বরিশালের কিছু অংশ নিয়ে খুলনা-২ আসন থেকে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন কি না আমার মনে নেই। সম্ভবত আমার পিতা মন্ত্রী হওয়ার পর উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমি ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করি।
প্রশ্ন: আপনাদেরকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না? উত্তর: আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে হোটেল ইন্টারকন্টিডেন্টাল থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়।
আমরা তখন তিন ভাই,তিন বোন ও আমার মাসহ সবাই ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। আমার পিতা শুধু রাজনীতি করেন। আমরা ভাই বোনদের কেউই রাজনীতি করি না। আমার পিতার মামলার স্বপক্ষে যেসকল দলিলপত্রাদি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়েছে তার কিছু আমি সরবরাহ করেছি। হাদিসের আলকে মানব জীবন বাইটি আমার পিতার লেখা। আমি বইটির প্রকাশক। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন কি ও কেন বইটিও আমার পিতার লেখা এবং আমি প্রকাশক। এটা সত্য নয় যে, এ মামলার আমার পিতার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য।
এরপর আদালতের প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন,আমাদের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার শরনখোলা থানার রাজৈর গ্রামে। খুলনা থেকে বাগেরহাটের দূরাত্ব ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালে খুলনা থেকে বাগের হাটে ট্রেন যোগাযোগ ছিল। সড়কপথে যোগাযোগ থাকলেও রাস্তা ভালো ছিল না। নদীপথে লঞ্চযোগেও বাগেরহাটে যাতায়াত করা যেত।
গত ১ আগস্ট মাওলানা ইফসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। গত ৬ মে তার পক্ষে করা জামিন আবেদন খারিজ করেছেন।
গত ১২ মে ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ধানমন্ডির বাসা থেকে জামায়াতের এই নেতাকে গ্রেফতার করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ৮ মে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর রাষ্ট্রপক্ষে কৌসুলি অ্যাডভোকেট হৃষিকেষ সাহা ১৫ টি অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে।
গত ২২ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে তদন্তের চুড়ান্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপক্ষ বরবার জমা দেন তদন্ত সংস্থা।
একাত্তরে ৭শ জনকে গণহত্যা,৮ জনকে হত্যা,২শ হিন্দু লোককে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাসহ ৩শ বাড়ি লুন্ঠন এবং ৪শ দোকান লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করার অপরাধ আনা হয়েছে।
একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে (ফরমাল চার্জে) মূল ৮৫পৃষ্ঠার ১৫ টি অভিযোগের ভিত্তিতে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয় ।
তদন্ত সুত্রে জানা যায় একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তদন্ত শুরু করে গত ২১ এপ্রিল শেষ করে।
গত ২৩ জুন একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করার আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশে পাকিস্তানিদের গঠন করা কথিত মালেক সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ইউসুফ এক সময় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বও পালন করেছেন।
[b]ঢাকা,জিই, ৫ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ[/b]
অপরাধ
ইউসুফের বিরুদ্ধে ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের নির্দেশ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ (একেএম) ইউসুফের মামলায় সব ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।





