প্রাতিষ্ঠানিক বড় বড় দুর্নীতি অনুসন্ধান এবং তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদকে) দেখা দিয়েছে মারাত্মক সমন্বয়হীনতা। একই অভিযোগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক টিম বার বার তথ্য চেয়ে চিঠি দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে বিভ্রান্তি।
কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বয় না থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিভ্রান্তি। বাড়ছে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও অসন্তোষ।এ ক্ষেত্রে তারা দায়ি করছেন,দুদকেকেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনাকে। একইসঙ্গে দুদকের দুর্বল মনিটরিং সিস্টেম ও ডাটাবেজ না থাকার বিষয়টিকেও তারা অভিযুক্ত করছেন।
তারা বলছেন, অনেক সময় দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় ৪২০ ধারায় দায়ের হওয়া একটি মামলা থানা থেকে দুদকে তদন্তের জন্য রেফার করা হলো। একই মামলা হয়তো কিছুদিন পর পুলিশের ডিসি অফিস থেকেও পাঠানো হলো। দুদক দুটি মামলাই আলাদাভাবে তদন্ত করে।
কেস স্টাডি-১: বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ঘটনা ২০১১ সালে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। দুদক প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি দুদক। পরে ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট জাতীয় দৈনিকে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দুদক সহকারি পরিচালক মাহবুবুল আলমকে কর্মকর্তা নিয়োগকরে। তিনি বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
পরে এবিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি কার্যক্রম শুরু করতে না করতেই এই টিমকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
পরে অনুসন্ধানের দায়িত্ব উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে আর তার নেতৃত্বে সহকারি পরিচালক মাহবুবুল আলম, আশিকুর রহমান, উপ-সহকারি পরিচালক নাসিরউদ্দিন বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
কিন্তু গত ১২ মার্চ হঠাৎ বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় (বর্তমানে সিলেট অফিসে কর্মরত) উপ-পরিচালক আবুল হোসেনকে। তিনি দায়িত্বের চিঠি পেয়ে ওই দিনই বেসিক ব্যাংকের কাছে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে চিঠি ইস্যু করেন।
বিষয়টি বেসিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অবহিত হয়ে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ব্যাংকটি জানায় ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তারা তথ্য-উপাত্ত প্রদান করেছে। আবার কেন চিঠি দেয়া হলো ? ফলে পরদিনই তার কাছ থেকে দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়।
জানা যায়,২০১৩ সালের ২০ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির প্রতিবেদনের পেপার কাটিংঅনুসন্ধানের অনুমতি চান উপ-পরিচালক আবুল হোসেন। একই দিন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্যও দৈনন্দিন কার্যক্রমের আওতায় একটি পেপার কাটিং পাঠান কমিশনে।
কেস স্টাডি-২: এদিকে গত সপ্তায় জনতা ব্যাংক ফরেন একচেঞ্জকরপোরেট শাখার একটি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয় উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারি। দায়িত্ব পাবার পর তিনি জনতা ব্যাংকের ওই শাখা থেকে বিলের অর্থ দাবিকারী ৬ প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত চেয়ে চিঠি পাঠান।
ওই চিঠি পেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়,ইতিপূর্বে দুদকের আরেক কর্মকর্তার চিঠির পর ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য উপাত্ত সরবরাহ করা হয়েছে।
অথচ দুদক কর্মকর্তারাই জানেনে কে কখন কাকে চিঠি দিচ্ছেন।এর আগে দুদকের উপ-পরিচালক মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে জনতা ব্যাংকের অংশটি অনুসন্ধান করেন। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে রপ্তানি বিল দাবিকারী ৬ প্রতিষ্ঠানের তথ্য উপাত্ত রয়েছে।
কেস স্টাডি৩: হল মার্ক গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় হল-মার্ক ও সহযোগী ৫ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফান্ডেড, নন-ফান্ডেডসহ ৩ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩৫ মামলা হয়।
উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের টিম অনুসন্ধান ও মামলাগু দায়ের করে। এর মধ্যে ফান্ডেড অংশের ১৯শ’ ৬৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চার্জশিট হয়।
তবে অনুসন্ধান ও মামলার আওতার বাইরে হলমার্ক ঋণ কেলেংকারির নন-ফান্ডেড অংশের দেড় হাজার কোটি টাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল কমিশন সভায় জনবলের স্বল্পতা দেখিয়ে নন-ফান্ডেড অংশ নিয়ে অনুসন্ধান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
আবার এদিকে জানা যায়, সোনালি ব্যাংকের অনুরোধে দুদক নন-ফান্ডেড অংশ তদন্তের লক্ষ্যে সোনালি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। অভ্যন্তরীণ কমিটির তদন্তের পর দুদক অনুসন্ধান করলে অভিযোগগুলো আরও সুনির্দিষ্ট হবে এবং দুদকের অনুসন্ধান সহজতর হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেয়।
দদুকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসির উদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন,দুদকের কাজে কিছুটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কিছু পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক সময় আগের ইনকোয়ারিতে তথ্য-উপাত্ত যথেষ্ট না পাওয়া গেলে অধিকতর ইনকোয়ারির জন্য হয়তো অন্য কাউকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়।
বেসিক ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের অনুসন্ধান সম্পর্কে তিনি বলেন, বড় একটি সমস্যা হচ্ছে আমাদের ডাটাবেজ নেই। মনিটরিং সিস্টেমও দুর্বল। অটোমেশন সিস্টেম ডেভলপ করা গেলে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।দুদকের কার্যক্রম অটোমেশন সিস্টেমে নিয়ে এলে এ সমস্যাগুলো থাকবে না।
ঢাকা, একে, ২৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





