লেক ঘেঁষা ফুটপাতেই গড়ে তোলা হয়েছে প্রাত ভ্রমণকারীদের হাঁটার স্থান ও শিশুদের খেলাধুলার পার্ক। পড়ন্ত বিকেলে শোনা যায় পাখিদের কিচির-মিচির।
সড়কের পাশ দিয়েই চলে গেছে লম্বা লেক। যদিও লেকে এখন পানি নেই, নতুন করে বাঁধানো হচ্ছে। উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের দুই নম্বর সড়ক, দুই পাশে গাছগাছালি ঘেরা মনোরম পরিবেশ।
ঠিক লেকের উল্টোদিকে থাকা আলিশান ভবনগুলোর সঙ্গে এক কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ১৩ নম্বর বাড়িটি। সাদা রঙের সাত তলার ভবনটির মূল ফটকের দুই পাশের লনেও রয়েছে গাছগাছালি।
পুরো বাড়িটিই খোলামেলা। প্রতিটি ফ্লোরেই কাঁচঘেরা বারান্দা ও জানালা। ছাদ থেকে চারতলা পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে লতা।
প্রবেশদ্বারের পাশেই ছোট একটি রিসিপশন রুম। সেখানে লাল শার্ট পরিহিত কেয়ারটেকার বসে আছেন। গ্যারেজে ঢাকা অবস্থায় রয়েছে তিনটি প্রাইভেটকার।
উত্তরার এই বাড়িটির মালিক ঢাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো. রমিজ উদ্দিন সরকার, যার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে।
রাজধানীতেই রমিজের ৫টি বাড়ির সন্ধান পেয়েছে দুদক। এছাড়া গাজীপুরে রয়েছে তার একরের পর একর জমি। জন্মভূমি কুমিল্লাতেও একই অবস্থা। পিছিয়ে নেই তার স্ত্রীও। তার নামেও রয়েছে জমাজমি আর পুঁজিবাজারে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ।
দুদকের নথিতে উল্লেখ করা রমিজের উত্তরার বাড়ির ঠিকনা অনুযায়ী মঙ্গলবার সরেজমিন অনুসন্ধানে যান পরিবর্তন ডটকমের এই প্রতিবেদক। সঙ্গে ছিলেন ফটোসাংবাদিক ওসমান গণি।
বাড়িটির ছবি ও ভিডিও করার সময় বাড়িটির রিসিপশনে বসে ছিলেন কেয়ারটেকার। এছাড়া সেখানে একজন নারী ছিলেন, সাথে ৫-৬ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। কেয়ারটেকার কিছুক্ষণ পরপর মুঠোফোনে কাউকে ফোন করছিলেন আর ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিলেন।
ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ শেষ করার পর বাড়িটির রিসিপশনে গিয়ে নক করলে ওই নারী এগিয়ে এসে গেট খুলে দেন। ভেতরে থাকা লোকটির সাথে কথা বলে জানা যায়, তার নাম ইসমাইল হোসেন। ইসমাইলের কাছে জানতে চাওয়া হয় বাড়ির মালিকের নাম কী? জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি না।
এখানে চাকরি করেন মালিকের নাম জানেন না এমন প্রশ্নে ইসমাইল বলেন, আমি চলতি মাসেই কাজে যোগ দিয়েছি, মালিকের নাম জানি না। আর আমাদের কারো সাথে কথা বলার অনুমতি নেই।
মালিক বাসায় আছেন কি-না এমন প্রশ্নে কেয়ারটেকার বলেন, সেটাও জানি না। এরপর অনেকটা তড়িঘড়ি করেই মুখের উপর গেট লাগিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যান ইসমাইল।
যদিও সম্পদের ‘কুমির’ ডিপিডিসি কর্মকর্তা রমিজ উদ্দিন পরিবর্তন ডটকমের কাছে স্বীকার করেছেন যে এই বাড়িটি তার। তিনি বলেন, আমার ঢাকাতে ৫টি বাড়ি নেই। দুটি বাড়ি আছে- একটা মিরপুরের পূর্ব মনিপুর ১৩০৭/ডি ছয়তলা ও উত্তরা ৫নং সেক্টরের ২নং রোডে ১৩ নম্বর বাড়ি। উত্তরার সাততলা ওই বাড়িতেই আমি থাকি।
মিরপুরের ২৮ মল্লিকা মিল্কভিটা রোডে চারতলা ফ্ল্যাট সম্পর্কে জানতে চাইলে রমিজ বলেন, না, সেখানে আমার কোনো বাড়ি নেই।
রামপুরা মহানগর হাউজিংয়ে ৮নং রোডের ২০২ ব্লক-ডি তে ৪.৫ কাঠা জমির ওপর ৫টি দোকান ও টিনশেড বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, এসব কিছু নেই। যা আছে আমার ইনকাম ট্যাক্সের মধ্যেই রয়েছে।
আর পূর্ব রামপুরা ১৭৭/৫/১ এলাকায় ৯.৪৮ শতাংশ জমি ওপর বাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, এটা ডেভেলপার কোম্পানিকে দেওয়া আছে, আমার স্ত্রীর নামে।
রমিজ বলেন, আমাকে হ্যারাসমেন্ট করার জন্য, এটা ভুয়া। চাকরি করি কিছু সম্পত্তি তো আছে, তবে ইনকাম ট্যাক্সে ফাইলে যা আছে। তার বাইরে আমার কিছু নেই।
রামপুরা মহানগর হাউজিংয়ে ৮নং রোডের ২০২ ব্লক-ডি তে ৪.৫ কাঠা জমির ওপর ৫টি দোকান ও টিনশেড বাড়ি না থাকার কথা জানালেও পরিবর্তন ডটকমকে সেখানে সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে এটি তারই জমি।
হাতিরঝিল দিয়ে রামপুরা মহানগর প্রজেক্টের ৮ নম্বর রোডে ঢুকতেই বাঁ পাশে দেখা গেল ২০২ নম্বর প্লটের উপর ৫টি দোকান। দোকানগুলো হলো— ভাইবোন লেডিস টেইলার্স, কফি হাউজ, কাবাব মহল, ফ্লোরা ফাস্টফুড ও আক্তার জেনারেল স্টোর। আর দোকানগুলোর পেছনে রয়েছে টিনশেড বাড়ি। যেখানে দুই একটি পরিবার ভাড়া থাকেন।
প্রতিটি দোকানে গিয়ে জমির মালিকের নাম জানতে চাইলে সেখানকার প্রত্যেকের মালিকের নাম জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। প্রতিটি দোকান প্রায় ২ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় তারা এসব দোকান চালাচ্ছেন।
ফ্লোরা ফাস্টফুড ও আক্তার জেনারেল স্টোরের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আক্তার নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রতিমাসে দোকান ভাড়া দেন।
অপূর্ব পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, জমির মালিক কে আমার জানা নেই। তবে আক্তার নামে একজন আছেন তিনিই ভাড়া তোলেন। আক্তার জেনারেল স্টোরের মালিক ছিলেন এই আক্তার, তার কাছ থেকে নিয়ে আমি এক বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছি।
অপূর্বের সূত্র ধরে পরিবর্তন ডটকম যোগাযোগ করে আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি তো এখন আর রমিজ মিয়ার অধীনে চাকরি করি না। আগে করতাম। আমার জানা মতে এই জমির মালিক রমিজ উদ্দিনের আত্মীয় আমেরিকা প্রবাসী ইভা ওরফে সেলিনা। তবে প্রতিমাসে আমি দোকান ও বাড়ি ভাড়া তুলে রাখি। রমিজ উদ্দিনের গাড়ি চালক এসে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যান।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আসে। এরপর অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপ-সহকারী পরিচালক শহিদুর রহমানের নেতৃত্বে দুদক প্রাথমিকভাবে রমিজের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য পায়।
ঢাকায় ৫টি বাড়ি ছাড়াও টঙ্গী ও গাজীপুরে নামে-বেনামে ৩০ একর জমি রয়েছে রমিজের। কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে একরে একরে জমি। জেলার মুরাদনগরে স্ত্রী সালমা পারভীনের নামে রয়েছে ৫০ বিঘা জমি। পুঁজিবাজারে এই দম্পতির নামে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ ছাড়াও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে।
এ ছাড়া রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গাজীপুরে জমি বিক্রি করে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার এবং পরে বাংলাদেশে ফেরত আনার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদক।সূত্র: পরিবর্তন।
এএস





