একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে করা আপিলে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনকালে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, মাওলানা সাঈদী যদি ১৯৭১ সালে কোন অপরাধ করত তাহলে দুটি বইয়ে অবশ্যই তার নাম থাকত। এটা খুবই সিগনিফিকেন্স (তাৎপর্যপূর্ণ) একটা বিষয়। এছাড়া পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে পিরোজপুরের কৃতি সন্তানদের তালিকায় তার নাম রয়েছে।
বুধবার আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান মাওলানা সাঈদীর পক্ষে দ্বিতীয় দিনের যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।
বুধবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজ্জাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে যুক্তি গ্রহণ করেন।
প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
বুধবার শুনানির ২৬তম দিনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী এসএম শাহজাহান।
বুধবার মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে দুটি বই জমা দিয়েছিলেন তার আইনজীবীরা।
বই দুটি হল কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণলায় কর্তৃক প্রকাশিত স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র এবং পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত পিরোজপুর জেলার ইতিহাস ।
যুক্তিতে তিনি বলেন, এ বই দুটিতে পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ রয়েছে এবং অন্যান্য অনেক বিষয়ের সাথে স্বাধীনতা বিরোধীদের নামও রয়েছে। কিন্তু বই দুটির কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মাওলানা সাঈদী যদি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতেন তাহলে এ বই  দুটিতে অন্তত কোথাও না কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম থাকত।
তিনি বলেন, পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বইতে পিরোজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনার পাশপাশি স্বাধীনতার বিরোধী রাজাকার, শান্তি কমিমিটির লোকজনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোথাও মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।
যুক্তিতে শাহজাহান বলেন, এমন কি এ বইয়ে পিরোজপুর জেলার কৃতি সন্তানদের নামের যে তালিকা রয়েছে সেখানে মাওলানা সাঈদীর ছবিসহ তার পরিচিতি রয়েছে যেখানে মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিনসহ আরো অনেক খ্যাতিমানদের নাম রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৭ সালে যখন কোন রাজনৈতিক সরকার ছিলনা দেশে। তাছাড়া বইটি যারা সম্পাদনা করেছেন তাদের মধ্যে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জামালুল হক মনুসহ অনেকে জড়িত ছিলেন। এখানেও আমার নাম নেই।
এসময় বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, মাওলানা সাঈদী যদি ১৯৭১ সালে কিছু করত তাহলে এ দুটি বইয়ে অবশ্যই তার নাম থাকত। এটা খুবই সিগনিফিকেন্স (তাৎপর্যপূর্ণ) একটা বিষয়। এছাড়া পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে পিরোজপুরের কৃতি সন্তানদের তালিকায় তার নাম রয়েছে। এটিও খুবই সিগনিফিকেন্স। বইটি সম্পাদনার সাথে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নাম রয়েছে। তিনি জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটাও ইমপরটেন্ট বিষয়।
এসময় অপর বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক বলেন, পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বইয়ে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে। সেখানেও সাঈদী সাহেবের নাম নেই। অথচ দানেশ মোল্লাসহ সেকেন্দার শিকদার এদের নাম বারবার এসেছে। কিন্তু সাঈদী সাহেবের নাম একবারও আসেনি।
এসময় বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা পিরোজপুর জেলার ইতিহাস বই থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে শুনিয়ে বলেন, এখানে জামায়াত নেতা কাউখালির মাওলানা আব্দুর রহিমের নাম রয়েছে। কিন্তু মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।
তখন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র বইটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি খুবই অথেনটিক একটি বই। মাওলানা সাঈদী সাহেব যদি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধী কাজের সাথে জড়িত থাকত তাহলে এ বইটি এবং পিরোজপুর জেলার ইতিহাস নামক বইটি যেখানে পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিবরণ রয়েছে এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের নামের তালিকা রয়েছে সেখানে কোথাও না কোথাও তার নাম থাকত।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষে ৭ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়েছে।
শুনানী শেষে মামলার কার্যক্রম আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবী করেছেন আদালত।
বুধবার মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষে ৭ নং অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়েছে। ৬ নং অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে এবং আসামীপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা উপস্থাপন করে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান প্রমানের চেষ্টা করেন পাড়েরহাট ৭ মে ঘটনার সঙ্গে মাওলানা সাঈদী জড়িত ছিলেন না।
তিনি বলেন, ৬ নং অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৮ জন সাক্ষী হাজির করেছে কিন্তু তাদের কেউই পাড়েরহাট বাজারের নন। কোন ভুক্তভোগীকে সাক্ষী হিসেবে আনা হয়নি। যারা আসছেন তারা কেউ ভুক্তভোগী নন।
তিনি বলেন, সাক্ষীদের কারো বাড়ি টেংরাটিলা, কারো বাড়ি চিথলিয়া, কারো বাড়ি হোগলাবুনিয়া এবং কারো বাড়ি বাজার থেকে দেড় দুই মাইল দুরে অন্য গ্রামে। [img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1390992711.jpg[/img]
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৭ নং অভিযোগে বলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সেলিম খানের বাড়িতে মাওলানা সাঈদীর দেখানো মতে লুটপাট শেষে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট শাহাজাহান বলেন, সেলিম খানের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করেনি। হাজির করেছে দূরের লোক।
শাহজাজান বলেন, আট নং সাক্ষী বলেছেন তিনি খালের ওপারে দাড়িয়ে সেলিম খানের বাড়িতে ধোয়া উড়তে দেখেছেন। কাজেই তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেননা এবং তিনি যে  বলেছেন সাঈদীর দেখানো মতে আগুন দেয়া হয়েছে তাও সত্য নয়।
আসামিপক্ষে ছিলেন আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাভোকেট তারিকুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী অ্যার্টনি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল ও ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলিদের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট এমকে রহমান।
যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত অবস্থায় মামলাল কার্যক্রম আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতবী করেন আদালত।
এর আগে গতকাল প্রথম দিনের আপিলের যুক্তি দেন আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।
গত ২১ জানুয়ারি আসামিপক্ষের সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ মামলার কার্যক্রম মুলতবি করেছিলেন আদালত।
ওই দিন সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান আসামিপক্ষের ১৬,১৭তম সাক্ষীর জেরা পড়ে শুনান।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর সাঈদীর মামলার শুনানি করা হয়েছিল। পরে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধের কারণে আর শুনানি করা হয়নি।
গত বছরের ২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের ১২০ পৃষ্ঠা পড়ে শোনান এ মামলার প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গত বছরের ২৮ মার্চ সাঈদী ও সরকারপক্ষ পৃথক দু’টি আপিল (আপিল নম্বর: ৩৯ ও ৪০) দাখিল করেন।
গত বছরের ৩ এপ্রিল আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদনের সারসংক্ষেপ জমা দেন রাষ্ট্রপক্ষ। ১৬ এপ্রিল সারসংক্ষেপ জমা দেন আসামিপক্ষ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণের আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দু’টি অপরাধে সাঈদীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ২৯ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জিই[/b]