মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানিতে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার নথি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যে দু'টি অভিযোগে আদালত মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ এর মধ্যে একটি।
ওই রায়ের আপিল শুনানিতে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ১৯৭২ সালে ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর দায়ের করা হত্যা মামলার চার্জশিটে মাওলানা সাঈদীর কোনো নাম নেই। একই সাথে তারা ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলার সব নথি তলবের জন্য পিরোজপুর আদালতের প্রতি আদেশ দেয়ারও আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা আসামিপক্ষের সব নথি জাল ও মিথ্যা।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগ আদালতে প্রামাণিত হয়। এর মধ্যে ২টি অভিযোগে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বাকী ১২টি অভিযোগ থেকে খালাস দেন আদালত। যেসব অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দিয়েছে,সেগুলোও পূর্ণ ন্যায় বিচার চায় রাষ্ট্রপক্ষ।
স্বাধীনতার পর পর বিচারিক আদালতে দায়ের হওয়া পিরোজপুরের ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলার নথি তলব বা তদন্তের বিষয়ে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক আবেদনের বিষয়ে বুধবার আদেশ দেবেন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার আদালতে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে শুনানি করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। এর জবাবে বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।আপিল শুনানির ৪৯তম দিনে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের জবাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এএসএম শাহজাহান।
আসামি পক্ষের আইনজীবী এস এম শাহ জাহান, ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে শুনানিতে ১৯৭২ সালে ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর করা হত্যা মামলায় দাখিল করা চার্জশিটের কপি আদালতে দাখিল করেন এবং বলেন এতে সাঈদীর কোনো নাম নেই। কুট্টি হত্যা মামলার সব নথি তলবের জন্য পিরোজপুর আদালতের প্রতি আদেশ দেয়ারও আবেদন করে আসামিপক্ষ।
আসামিপক্ষের দাখিল করা নথি জাল ও মিথ্যা উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে আসামিপক্ষ ইব্রাহিম কৃট্টি হত্যার বিষয়ে তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের ১৯৭২ সালে দায়ের করা মামলার চার্জশিটের কপি আদালতে দাখিল করেন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগ হলো ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
আসামিপক্ষ বলেন, ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে তার স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি মোট ১৩ জনকে আসামি করেন। কিন্তু সেই তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। আসামিপক্ষ মমতাজ বেগমের দায়ের করা সেই মামলার এফআইআর নথির একটি সার্টিফাইড কপি ২০১১ সালে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়।
এ মামলার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পিরোজপুর ও বরিশাল সফর করেছেন। সফর শেষে ৯ এপ্রিল আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন,পিরোজপুর ও বরিশালের জেলাজজ আদালতে কোথাও এ মামলার কাগজ পাওয়া যায়নি।
আসামিপক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার নথি মর্মে যে ডকুমেন্ট জমা দিয়েছে,তা জাল,মিথ্যা এবং মামলার প্রয়োজনে সৃজনকৃত। তাই এ কাগজ বিবেচনায় না নেয়ার লিখিত আবেদন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
আসামিপক্ষের দায়ের করা এফআইআর কপিটি জাল আখ্যায়িত করা এবং এটি বিবেচনায় না নেয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে যেসব যুক্তি আদালতে তুলে ধরা হয়,তার মধ্যে অন্যতম ছিল মমতাজ বেগমের দায়ের করা মামলার চার্জশিট বিষয়ক।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন,আসামিপক্ষ দাবি করেছে এ মামলায় চার্জশিট হয়েছিল,কিন্তু তারা সেই চার্জশিট জমা দেয়নি। একটি মামলার প্রাথমিক অভিযোগে সব বা মূল আসামির নাম নাও থাকতে পারে। কিন্তু পরে চার্জশিটে মূল আসামির নাম আসতে পারে বা অন্য আসামির নাম যোগ হতে পারে। আসামিপক্ষ মামলার এফআইআর কপি জোগাড় করতে পারল আর চার্জশিট তারা জোগাড় করতে পারল না? তারা কেন চার্জশিট তুলতে পারল না,এমন প্রশ্ন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
১৯৭২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ এ মামলর চার্জশিট দাখিল করে। মমতাজ বেগমের মামলার প্রাথমিক অভিযোগ বা এফআইআরে ঘটনার বিবরণ, তারিখ ও ঘটনাস্থলের যে বিবরণ রয়েছে, তার সঙ্গে মিল রয়েছে চার্জশিটে বর্ণিত ঘটনা, ঘটনার তারিখ ও ঘটনাস্থলের। তবে এফআইআরে যে ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে তা থেকে ৪ জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে মাওলানা সাঈদী বা অন্য কোনো নতুন আসামির নাম এ ঘটনায় আর যুক্ত হয়নি চার্জশিটে।
ওই চার্জশিটে যাদের নাম রয়েছে,তারা হলেন দানেশ মোল্লা, আশরাফ আলী, আব্দুল মান্নান,কালাম চৌকিদার,আব্দুল হাকিম মুন্সি,মমিন উদ্দিন ও মোসমেল মওলানা।
চার্জশিটে বলা হয়,পলাতক (১. দানেশ আলী মোল্লা ২. আশরাফ আলী ৩. আব্দুল মমিন হাওলাদার ৪. আব্দুল কালাম চৌকিদার, ৫. আবদুল হাকিম মুন্সি,৬. মমিন উদ্দিন ৭. মোসলেম মাওলানা) এবং ৩ নং কলামে বর্ণিত গ্রেফতারকৃত (আইউব আলী ও সুন্দর আলী) আসামিরা ১/১০/৭১ তারিখ রাইফেলসহ মমতাজ বেগমের ঘরে প্রবেশ করে তার স্বামী ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করে, রাইফেলের গুলিতে মমতাজ বেগমের হাতে জখম হয়,তাদের বাড়ির জিনিসপত্র লুট করে,তার (মমতাজ বেগম) ভাই সাহেব আলী ওরফে সিরাজকে অপহরণ করে পাকিস্তান আর্মির কাছে তুলে দেয়,পাকিস্তান আর্মিরা তাকে পরে হত্যা করে।
আসামিদের সবাই রাজাকার এবং দালাল। তদন্তে প্রাথমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১ নং কলামে বর্ণিত ৪ জনকে (আতাহার আলী হাওলাদার,রুহুল আমিন,সেকেন্দার আলী সিকদার ও শামসুর রহমান) অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে।
গত ৩ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল শুনানির সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েন।
আদালত তখন তাকে প্রশ্ন করেন,'আসামিপক্ষ মমতাজ বেগমের মামলার ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে পারল আর আপনারা পারলেন না কেন? ১৯৭২ সালে আদৌ এ ধরনের কোনো এফআইআর হয়েছিল কি না? পিরোজপুরে অবশ্যই জিআর রেজিস্ট্রেশন বই আছে। আপনারা এটা চাইতে পারতেন না? আপনাদের অনেক বড় মেশিনারিজ আছে। তার মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন? আমরা যদি আসামিপক্ষের দায়ের করা এ ডকুমেন্ট গ্রহণ করি তাহলে অ্যাটলিস্ট আমরা বলতে পারি সাঈদী এ ঘটনায় জড়িত নয়।' আদালত আরও বলেন, 'আপনারা অনেক সময় পেয়েছেন। এ দীর্ঘ সময়ে আপনারা চাইলে এ ডকুমেন্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারতেন।'
কুট্টি হত্যার সঙ্গে সাঈদীর জড়িত থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে,১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীসহ শান্তি কমিটির অন্যান্য লোকজনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সৈন্যরা ওই বাড়িতে আক্রমণ করে। এ সময় ইব্রাহীম কুট্টি ও অপর আরেকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাড়েরহাট বাজারে। পরে মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে পাকিস্তান সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে পাড়েরহাট বাজারে।
রাষ্ট্রপক্ষের এ অভিযোগের বিপরীতে আসামিপক্ষ দাবি করে, ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর নলবুনিয়ায় তার শ্বশুরবাড়ি থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার সঙ্গে মাওলানা সাঈদী জড়িত নন। এ দাবির পক্ষে তারা ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগমের মামলার নথি জমা দিয়েছে আদালতে। মমতাজ বেগমের মামলায় ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা বিষয়ে মোট ১৩ জন আসামি করা হয়। আসামির তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। আসামিপক্ষের দাবি, তিনি যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকতেন তাহলে অন্তত মমতাজ বেগমের মামলায় তাকে তখন আসামি করা হতো।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে এবং ১০ এপ্রিল তা শেষ হয়।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আপিল বিভাগে আসামিপক্ষ তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর সাঈদীর মামলায় প্রথম আপিল শুনানি শুরু হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৮ র্মাচ আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক দু'টি আপিল দাখিল করে।
[b]ঢাকা, কেএ, ১৫ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসআর // এআর[/b]
অপরাধ
ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার নথি নিয়ে দ্বন্দ্ব
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল শুনানিতে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার নথি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ওই রায়ের আপিল শুনানিতে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ১৯৭২ সালে ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রীর দায়ের করা হত্যা মামলার চার্জশিটে মাওলানা সাঈদীর কোনো নাম নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা আসামিপক্ষের সব নথি জাল ও মিথ্যা





