একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মে) দিবাগত রাত ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক রাত ১২টা ১০মিনিট। অনুমতি পাওয়ার পরই জল্লাদ রাজু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করেন মৃত্যুদণ্ড।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ফাঁসি কার্যকরের এ খবর নিশ্চিত করেছেন ।
তিনি প্রাণ ভিক্ষা চাননি। তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ ও র্যাবের বেশ কয়েকটি গাড়ি নিরাপত্তার জন্য মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে পাঠানো হচ্ছে।
এর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাওলানা নিজামীকে একটি প্রতিনিধিদল জিজ্ঞাসাবাদ করে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। এই দলে ছিলেন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রিজনস) ইকবাল কবীর, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়াদের মধ্যে পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে মাওলানা মতিউর নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হলো।
কর্মকর্তাদের কারাগারে প্রবেশ
রাত ১০টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিন। এছাড়া সিভিলসার্জন, অতিরিক্ত মহা-কারা পরিদশর্ক, ডিবি উত্তরের ডিসিসহ ১২ সদস্যের দল কারাগারে পৌছেন।
কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স
এদিকে ফাঁসি কার্যকরের পর নিজামীর লাশ বহনের জন্য চারটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই নির্দেশ প্রদান করে রাখেন কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ।
স্বজনদের সাক্ষাৎ
রাত পৌনে ৮টার দিকে তিনটি মাইক্রোবাসে করে নিজামীর পরিবারের ২৬ জন সদস্য কারাগারের ফটকে আসেন। এরপর তাঁরা ভেতরে ঢোকেন।
এর আগে গতকাল সোমবার রাত ৯টার দিকে নিজামীকে রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায় পড়ে শোনানো হয়। সেদিন বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায় প্রকাশ করেন।
এরপর বিকেল ৫টার কিছু পর আপিল বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল রায়ের কপি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সেদিন সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে লাল কাপড়ে মোড়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে রওনা হয়। পরে ৭টা ৫ মিনিটে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবীর রায়ের কপি নেন।
গত রোববার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মতিউর রহমান নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়।
গত ৫ মে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মাওলানা নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্দেশদাতা, পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ে (সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) মাওলানা নিজামীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে মাওলানা নিজামী তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘ এবং আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আলবদর বাহিনী একটি অপরাধী সংগঠন এবং এ বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যায় মাওলানা নিজামীর নৈতিক সমর্থন ছিল। ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘ এবং বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে এসব সংগঠনের সদস্যদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। কাজেই ঊর্ধ্বতন নেতা হিসেবে মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের দায় তিনি এড়াতে পারেন না।
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আটটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে।
এর মধ্যে চারটি অভিযোগের প্রতিটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য চারটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
গত ৬ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে রায় দেন। আপিল বিভাগের রায়ে মৃত্যুদণ্ডের তিনটি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দু’টি দণ্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। গত ১৫ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর ১৫ দিনের মধ্যে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন মাওলানা নিজামীর পক্ষে তার আইনজীবীরা। গত ৩ মে রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য উসকানি, পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র এবং বৃদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয় ২০১২ সালের ২৮ মে।
২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর এ মামলার বিচার কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ অপেক্ষমাণ ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল; কিন্তু রায় ঘোষণার আগে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বদল হওয়ায় পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন করা হয় এবং ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ দ্বিতীয় দফায় মামলার রায় অপেক্ষমাণ ঘোষণা করা হয়।
২০১৪ সালের ২৪ জুন মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছিল। মাওলানা নিজামী অসুস্থ থাকায় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে না পারায় ওই দিন রায় ঘোষণা থেকে বিরত থাকে ট্রাইব্যুনাল।
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৬৭ জন সাক্ষীর তালিকা দেয়। এখান থেকে ২৬ জনকে হাজির করে তারা। অন্য দিকে আসামিপক্ষ ১০ হাজার ১১১ জন সাক্ষীর তালিকা দেয়। আসামিপক্ষে চারজন সাক্ষী নির্ধারণ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল এবং তারা চারজন সাক্ষী হাজির করে।
চার সদস্যের আপিল বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম লুৎফর রহমান খান।
স্থানীয় বোয়ালমারি মাদরাসা থেকে ১৯৫৯ সালে আলিম পরীক্ষায় তিনি মাদরাসা বোর্ডে ষোলতম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬১ সালে ফাজিল এবং ১৯৬৩ ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাস করেন তিনি। কামিল পরীক্ষায় ফিকাহ শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত তিনি তিনবার পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিখিল পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবার (ইসলামী ছাত্রসঙ্ঘ) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মাওলানা নিজামী ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জামায়াতের ঢাকা মহানগর শাখার আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৮ সালে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির নির্বাচিত হন।
মাওলানা নিজামী পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সংসদ সংসদ্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চার ছেলে ও দুই কন্যাসন্তানের বাবা।
মাওলানা নিজামীর পক্ষে এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে আইনজীবী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনজুর আহমদ আনসারী, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, তারিকুল ইসলাম, আসাদ উদ্দিন প্রমুখ। সুপ্রিম কোর্টে মাওলানা নিজামীর পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর হায়দার আলী, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী, প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ প্রমুখ দায়িত্ব পালন করেন এ মামলায়। অন্য দিকে আপিল বিভাগে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
বহির্বিশ্বের উদ্বেগ:
এর আগে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যদণ্ড না দেয়ার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, মার্কিন কংগ্রেস ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দাবি জানায়। এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে এই বিচারের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে ন্যায়বিচারের স্বার্থে ফাঁসি কার্যকর না করতে জোর সুপারিশ করা হয়। তবে সব অনুরোধ উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হয় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ।
ওএফ/কেবি





