রাজধানীর বাসাবাড়ি এমনকি অফিস পাড়ায় আতঙ্কের অপর নাম ‘হিজড়া’। অযৌক্তিক চাঁদা দাবি, জোরপূর্বক নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়াসহ খারাপ ও অশোভন আচরণ থেকে রেহাই পান না কেউই।
রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সাধারণ পথচারি, দোকানদার এমনকি যানবাহন চাকলদের গুনতে হয় হিজড়াদের চাহিদা মতো চাঁদা। অন্যথায় নানাভাবে নাজেহাল হতে হয় তাদের। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় এমন ঘটনা অহরহ হলেও কোন সুরাহা মিলছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও মিলছেনা কোন প্রতিকার। কেউ কিছু বললে সোজা থানা ঘেরাও। ফলে পুলিশও তাদের ভয় পায় বলে জানা গেছে।
হিজড়াদের উৎপাত একসময় শহরকেন্দ্রীক থাকলেও বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে এদের উৎপাত। রাস্তা, দোকন, বাসা, পরিবহণ কোনো স্থানেই হিজড়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাধারণ নাগরিকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে এলাকাভাগ করে কয়েকটি চক্র মাসিক বেতনভূক্ত হিজড়া দিয়ে এসব চাঁদাবাজি পরিচালনা করে থাকে। প্রতিটি বাসা, দোকান, মার্কেট, অফিসভেদে সাপ্তাহিক ও মাসিক হিসেবে এসব চাঁদা সংগ্রহ করে থাকে এই হিজড়া চক্র। কোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত চাঁদা না দিলেই অপদস্ত হতে হয় হিজড়াদের হাতে। ফলে বাধ্য হয়েই এসব চাঁদা পরিশোধে বাধ্য হয় ভোক্তভোগীরা।
শুধু মাসিক বা সাপ্তাহিক চাঁদা নিয়ে ক্ষান্ত হয়না হিজড়ারা। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, নববর্ষ (নিউ ইয়ার), জনসাধারণের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ নানা অযুহাতে গুনতে হয় বড় অংকের বিশাল চাঁদা। এছাড়া কোনো হিজড়া মারা গেলে সেই অযুহাতেও তোলা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। অন্যান্য উৎসবের মতো এবারো ৩১ডিসেম্বরের আগে এরা নেমেছিল বিশেষ অভিযানে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চালায় চাঁদাবাজি।
ফার্মগেট এলাকার ভুক্তভূগী এক বাড়ির মালিক টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ‘চার হিজড়া বাসায় ঢুকে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছে। তারা জানায় ৩১ডিসেম্বর রাত উপলক্ষ্যে অনেক খরচ আছে। ৩০০ টাকা দিলে তা ফেরৎ দিয়ে দেয়। কাঙ্খিত চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা আমাকে পরিবারের সামনে লাঞ্চিত করতে শুরু করে। পরে প্রতিবেশীরা আমাকে উদ্ধার করেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমার এক ছেলে জন্মগ্রহণ করার পর আমার বাসায় এ হিজড়ারা সাত হাজার টাকা দাবি করে। তখন তাদেরকে তিন হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করি। এরা শুধু আমার নয় এই মহল্লার প্রায় সব বাসায় বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা আদায় করে।’
হিজড়াদের কাছে বিষটি জানতে চাইলে, তারা বলে তুই কে? ৩১ডিসেম্বর রাত আমাদের অনেক খরচ আছে টাকা উঠাইতে আসছি। সাহেবের কাছ থেকে টাকা নিব। ওনার টাকা কি তুই দিবি? পুলিশ ডাকার কথা বললে হিজড়ারা বলে পুলিশ ডেকে কোনো লাভ হবে না। আমাদের টাকা দরকার কাল আবার আসব।
ট্রাফিক সিগন্যালে হিজড়াদের চাঁদাবাজি:
হিজড়াদের টাকা তোলার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। আগে মানুষ যা দিত, তা নিয়েই খুশি থাকতো হিজড়ারা। কিন্তু এখন তাদের আচরণ বদলে গেছে। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট যেখানে-সেখানে টাকার জন্য মানুষকে নাজেহাল করছে তারা।
হিজড়াদের কয়েকজন অভিযোগ করছেন, রাজধানীতে অনেক ‘নকল’হিজড়া আছে, যাদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জন করা। ট্রাফিক সংকেতে যানবাহন থামার পর হিজড়ারা সামনে এসে দাঁড়ালে যাত্রীদের কিছু করার থাকে না। রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যালে দলবেঁধে ওঁৎপেতে থাকে হিজড়ার দল। যাদেরকে আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রন করে একটি দালালচক্র।
নবজাতকের খবর পেলেই টাকা দাবি:
রাজধানীতে হিজড়ারা রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ঢাকার যেকোনো প্রান্তে কোনো বাড়িতে নবজাতকের আগমনী বার্তা পেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে হিজড়ারা। নিজস্ব ভঙ্গীর নাচ-গানের পর মোটা অঙ্কের বকশিশ দাবি করে তারা। কাঙ্খিত চাঁদা আদায় না হলে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে ও বিব্রতকর করে ফেলে। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় বড় অঙ্কের চাঁদা।
হিজড়াদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী:
হঠাৎ বাসার গেটে হইচই। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটি দরজা খুলে দিলো। হুড়হুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল সালোয়ার-কামিজ এবং শাড়ি পরা সাত-আটজন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ওই মেয়েটির কাছে টাকা দাবি করল। তাও অল্প নয়, ১০ হাজার টাকা। মেয়েটির চিৎকার শুনে তার মা এগিয়ে আসেন। টাকা দিতে না চাইলে তাদের ব্যাপক গালাগালি। একপর্যায়ে দুই হাজার টাকা এবং একটি নতুন শাড়িতে রফা-দফা। খিলগাঁওয়ের বৌদ্ধ মন্দির এলাকার একটি বাড়িতে এভাবেই মহাবিপদ থেকে রক্ষা পান মা-মেয়ে।
রাতের ঢাকায় অন্য রুপে হিজড়া:
হিজড়ারা শুধু ছোটখাটো চাঁদা বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করতেন। এখন তারা বদলে নিয়েছে তাদের জীবিকার ধরন। জড়াচ্ছেন নানা অনৈতিক ও প্রতারণামূলক কাজে। রাজধানী যখন রাতের আঁধারে ঢাকা পড়ে তখন বোরখায় নিজেদের ঢেকে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয় তারা। সাধারণ ছাপোষা পুরুষরাই তাদের টার্গেট। বোরখায় ঢাকা থাকায় প্রথমে বোঝা যায় না তাদের। পরবর্তিতে কথা বললে বোঝা যায়।
হিজড়াদের অনেকের অভিযোগ, অনেক সময় সাধারণ ছেলেরা হিজড়া সেজে চালাচ্ছে এসব অপকর্ম। ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে তাদের চোখে চোখ পড়লে শুরু হয় ইশারায় কথা। তারপর দরদাম, সমঝোতা হলে এক রিকশায়, তারপর দেখা যায় তাদের সহিংস চেহারা।
ঢাকার হিজড়া সম্প্রদায়:
সারা বিশ্বেই হিজড়ারা একটি কমিউনিটি পরিচালনা করে। কমিউনিটির মধ্যে তারা আবার যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। ঢাকাতেও তার বিকল্প নয়। ঢাকাতে হিজড়ারা মূলত পাঁচটি দলে বিভক্ত। এক দলের হিজড়ারা অন্য দলের এলাকায় গিয়ে টাকা তুলতে পারবে না। তাদের এই পাঁচটি দলের প্রত্যেকটিতে আছে একজন করে গুরু। আর এসব গুরুর মধ্যে রয়েছে আরো শাখা প্রশাখা। এসব এলাকা আর তাদের গুরু হচ্ছে।
১. শ্যামপুর, ডেমড়া ও ফতুল্লা, গুরু- লায়লা হিজড়া।
২. শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুরু- হামিদা হিজড়া।
৩. সাভার, ধামরাই, গুরু- মনু হিজড়া।
৪. নয়াবাজার ও কোতোয়ালী, গুরু- সাধু হিজড়া।
৫. পুরোনো ঢাকা, গুরু- দিপালী হিজড়া।
ঢাকার হিজড়া ও তাদের আয়:
হিজড়াদের স্বপ্রণীত আইন অনুযায়ী ছেলে সন্তান হলে পাঁচ হাজার টাকা, মেয়ে সন্তানের জন্য তিন হাজার টাকা ও বিয়ের জন্য পাঁচ থেকে ১০ হাজার, অন্যান্য অনুষ্ঠানে আরও কয়েক হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া দোকানে দোকানে দলবেঁধে গিয়ে চাঁদাবাজি করে। চাঁদার টাকা না দিলেই গালাগাল করে। টাকা না পেয়ে দোকানের মালামাল নিয়ে যায় তারা।
নিচে পেশা অনুসারে এদের দৈনিক আয়ের একটি তালিকা দেওয়া হলো- নবজাতকের উৎসবে- ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। চাঁদা (দোকান)- ৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা- ৫০০-৫,০০০ টাকা। যৌন কর্মী- ০ থেকে ৩০০ টাকা। অন্যান্য- ০ থেকে ২,০০০ টাকা।
এদের আয়ের সব টাকাই এরা গুরুর হাতে দিয়ে দেয়। তাই দেখা যায় হিজড়াদের অনেক গুরুরই ঢাকা শহরে বাড়ি রয়েছে। আয়ের বেশিরভাগ টাকাই এরা সাজে ব্যবহার করে থাকে।
কোটিপতি হিজড়া:
হিজড়াদের মধ্যে কারো কারো রয়েছে অঢেল সম্পদ। তারা কিভাবে এসব সম্পদ গড়েছে সংশ্লিষ্টরা তার কোনো জবাব দিতে পারেনি। তবে নানা মাধ্যমে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে অনেক হিজড়া।
খিলক্ষেত এলাকায় দলনেতা নাজমার অধীনে রয়েছে ৪০ জন হিজড়া। ৩০ বছর আগে পুরষাঙ্গ কেটে হিজড়া হয়েছে নাজমা। সে এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ পরিচিত। তার প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিভিন্ন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের কাছে সুদে দেয়া আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে তার মাসিক আয় প্রায় ২ লাখ টাকা। ঢাকায় তার তিনটি বাড়ি ছাড়াও একাধিক প্লট রয়েছে। তার এসব বাড়ি সায়দাবাদ, খিলক্ষেত ও গাজীপুর বোর্ডবাজার এলাকায়।
খিলক্ষেত বটতলা এলাকার আলম জানান, বটতলা ক-১৮৩/৫ নং মায়ের দোয়া নাজমা ভিলায় থাকে নাজমা। এটি তার নিজের বাড়ি। নাজমার বউরাইতেও দুটি প্লট রয়েছে বলে জানা গেছে।
নাজমা একাধিক ছেলেকে ভারত, খুলনার ফুলতলা ও ধামরাইয়ের রোম আমেরিকান হাসপাতাল থেকে হিজড়া বানিয়েছে। ধলপুর এলাকার আবুল হিজড়াও দুটি বাড়ি ও কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি করে।
তার ভাগ্নে রবিন জানান, গোলাপবাগ এলাকার ১৩/বি/১ নম্বরে ৫ তলা ও ধলপুর লিচুবাগানে একটি ৪ তলা ভবনের মালিক আবুল। দক্ষিণখান থানার এলাকার দলনেতা রাহেলা হিজড়াও মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি করে টাকার পাহাড় গড়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তার আসল নাম মোহাম্মদ আলী। প্রায় ৩২ বছর আগে হিজড়া হয়েছে সে। তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীও আছে দক্ষিণখান থানা এলাকায়।
হিজড়ার প্রকারভেদ:
শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে এদেরকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। শারীরিক ভাবে পুরুষ কিন্তু মানষিকভাবে নারী বৈশিষ্টের অধীকারী হিজড়াদের বলা হয় অকুয়া, অন্য হিজড়াদের বলা হয় জেনানা, আর মানুষের হাতে সৃষ্ট বা ক্যাসট্রেড পুরুষদের বলা হয় চিন্নি।
হিজড়ার বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা:
এক্স এক্স প্যাটার্ন ডিম্বানুর সমন্বয়ে কন্যা শিশু আর এক্স ওয়াই প্যাটার্ন থেকে সৃষ্ট হয় ছেলে শিশু। ভ্রুনের পূর্ণতার স্তরগুলোতে ক্রোমোজোম প্যাটার্নের প্রভাবে ছেলে শিশুর মধ্যে অন্ডকোষ আর কন্যা শিশুর মধ্য ডিম্ব কোষ জন্ম নেয়। অন্ডকোষ থেকে নিসৃত হয় পুরুষ হরমোন এন্ড্রোজেন এবং ডিম্ব কোষ থেকে নিসৃত হয় এস্ট্রোজেন। ভ্রুনের বিকাশকালে নিষিক্তকরন ও বিভাজনের ফলে বেশকিছু অস্বাভাবিক প্যাটার্নের সৃষ্টি হয় যেমন এক্স এক্স ওয়াই অথবা এক্স ওয়াই ওয়াই। এর ফলে বিভিন্ন গঠনের হিজড়া শিশুর জন্ম হয়।
অধিকাংশই হিজড়াই স্বাভাবিক পরিবারের সাথে সংসার করতে পারবে। অনেকের স্ত্রী ও সন্তান থাকার পরও চিকিৎসার মাধ্যমে শারীরিক গঠন পরিবর্তন করে সমাজে হিজড়া হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছে। এ পরিচয়ের সুবাধে অনেকেই চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী ও অসামাজিক কাজকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।
সমাধান:
দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রেখে মূলধারার জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা সম্ভব হলে এরা আর সমাজের বোঝা কিংবা আতংক না হয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তরিত হতে পারে। বিজ্ঞজনরা মনে করেন, হিজড়া শিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে সমাজের আর কয়েকটি শিশুর মতোই তাদেরকে পড়াশুনা ও স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। পরিণত বয়সে যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী তাদেরকে চাকরি কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য করতে দিতে হবে। আর এভাবেই হিজড়ারা মূলধারার জনশক্তিতে পরিণত হয়ে দেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান করতে পারবে।
এসএম/কেবি





